সাহাবায়ে কেরাম হকের মাপকাঠি | সমালোচনা করা হারাম | Bangla Islam

সাহাবায়ে কেরাম হকের মাপকাঠি
সাহাবায়ে কেরাম হকের মাপকাঠি সমালোচনা করা হারাম Bangla Islam

সাহাবায়ে কেরাম হকের মাপকাঠি

কেহ যদি প্রশ্ন করে সাহাবায়ে কেরাম হকের মাপকাঠি কিনা তাহলে তাকে প্রথমে জানতে হবে সাহাবী কারা? উত্তরঃ সাহাবী একটি আরবী শব্দ “সুহবাতুন” ধাতু বা মাছদার হতে নির্গত যার অর্থ সাহচর্য গ্রহণ করা, সংস্পর্শে থাকা, সঙ্গ দেওয়া।

শরীয়তের পরিভাষায় সাহাবী :

الصّحابي اصطلاحًا: قال ابن حجر: وأصح ما وقفت عليه من ذلك أن الصحابي من لقي النبي صلى الله عليه وسلم مؤمناً به،

ومات على الإسلام؛ فيدخل فيمن لقيه من طالت مجالسته له أو قصرت،

ومن روى عنه أو لم يرو، ومن غزا معه أو لم يغز،

ومن رآه رؤية ولو لم يجالسه، ومن لم يره لعارض كالعمى

সাহাবী ঐ ব্যক্তিকে বলা হয় যিনি রাসুলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে ইসলাম গ্রহন করে ঈমান এনেছেন

এবং ঈমানী অবস্থায় মৃত্যু বরণ করেছেন। এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে তাঁদের সঙ্গ স্বল্প সময়ের জন্য হোক

বা দীর্ঘ সময়ের জন্য হোক। তাঁরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে হাদিস বর্ণনা করুক বা নাই করুক।

তাঁরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে জিহাদে অংশ গ্রহণ করুক বা নাই করুক।

হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, যে ব্যক্তি কুরআন পড়ে তার বিধান অনুযায়ী আমল করবে, আল্লাহ তাআলা তাকে গোমরাহি থেকে রক্ষা করবেন এবং আখেরাতের আযাব থেকে মুক্তি দেবেন।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:

قَالَ اهْبِطَا مِنْهَا جَمِيعًا بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ

فَإِمَّا يَأْتِيَنَّكُم مِّنِّي هُدًى

فَمَنِ اتَّبَعَ هُدَايَ فَلَا يَضِلُّ وَلَا يَشْقَى

তিনি বললেনঃ তোমরা উভয়েই এখান থেকে এক সঙ্গে নেমে যাও। তোমরা একে অপরের শত্রু।

এরপর যদি আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে হেদায়েত আসে,

তখন যে আমার বর্ণিত পথ অনুসরণ করবে, সে পথভ্রষ্ঠ হবে না এবং কষ্টে পতিত হবে না। [ সুরা ত্বা-হা আয়াত :১২৩

মহানবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবীগণ তাঁহার কাছ হতে দ্বীনি বিষয় শিক্ষাপ্রাপ্ত সম্মানিত এক দল।

যাঁহাদের সম্বন্ধে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উক্তি হল:

اكرموا أصحابى فإنهم خياركم

তোমরা আমার সাহাবীগণকে সম্মান কর। কেননা তাঁহারা তোমাদের মধ্যকার উত্তম মানব।

পবিত্র কোরআনের বর্ণনায় সাহাবায়ে কেরাম হকের মাপকাঠি হওয়ার প্রমাণ:

 

প্রথম আয়াত:

كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ

وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللّهِ وَلَوْ آمَنَ أَهْلُ الْكِتَابِ

لَكَانَ خَيْرًا لَّهُم مِّنْهُمُ الْمُؤْمِنُونَ وَأَكْثَرُهُمُ الْفَاسِقُونَ

তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যানের জন্যেই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করবে

ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে। আর আহলে-কিতাবিরা যদি ঈমান আনতো,

তাহলে তা তাদের জন্য মঙ্গলকর হতো। তাদের মধ্যে কিছু তো রয়েছে ঈমানদার আর অধিকাংশই হলো পাপাচারী। সুরা ইমরান আয়াত :১১০

দ্বিতীয় আয়াতঃ

وَكَذَلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِّتَكُونُواْ شُهَدَاء عَلَى النَّاسِ

وَيَكُونَ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًا وَمَا جَعَلْنَا الْقِبْلَةَ الَّتِي كُنتَ عَلَيْهَا

إِلاَّ لِنَعْلَمَ مَن يَتَّبِعُ الرَّسُولَ مِمَّن يَنقَلِبُ عَلَى عَقِبَيْهِ وَإِن كَانَتْ لَكَبِيرَةً

إِلاَّ عَلَى الَّذِينَ هَدَى اللّهُ وَمَا كَانَ اللّهُ لِيُضِيعَ إِيمَانَكُمْ

إِنَّ اللّهَ بِالنَّاسِ لَرَؤُوفٌ رَّحِيمٌ

এমনিভাবে আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী সম্প্রদায় করেছি যাতে করে তোমরা সাক্ষ্যদাতা হও মানবমন্ডলীর জন্যে

এবং যাতে রসূল সাক্ষ্যদাতা হন তোমাদের জন্য। আপনি যে কেবলার উপর ছিলেন, তাকে আমি এজন্যই কেবলা করেছিলাম,

যাতে একথা প্রতীয়মান হয় যে, কে রসূলের অনুসারী থাকে আর কে পিঠটান দেয়। নিশ্চিতই এটা কঠোরতর বিষয়,

কিন্তু তাদের জন্যে নয়, যাদেরকে আল্লাহ পথপ্রদর্শন করেছেন। আল্লাহ এমন নন যে, তোমাদের ঈমান নষ্ট করে দেবেন।

নিশ্চয়ই আল্লাহ, মানুষের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল, করুনাময়। সুরা বাকারা আয়াত :১৪৩

তৃতীয় আয়াতঃ

وَالسَّابِقُونَ الأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالأَنصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُم بِإِحْسَانٍ رَّضِيَ اللّهُ عَنْهُمْ

وَرَضُواْ عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي تَحْتَهَا الأَنْهَارُ

خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ

আর যারা সর্বপ্রথম হিজরতকারী ও আনছারদের মাঝে পুরাতন, এবং যারা তাদের অনুসরণ করেছে, আল্লাহ সে সমস্ত লোকদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন

এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। আর তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন কানন-কুঞ্জ, যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত প্রস্রবণসমূহ।

সেখানে তারা থাকবে চিরকাল। এটাই হল মহান কৃতকার্যতা। সুরা তাওবা আয়াত :১০০

চতুর্থ আয়াতঃ

وَالَّذِينَ جَاؤُوا مِن بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا

وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِّلَّذِينَ آمَنُوا

رَبَّنَا إِنَّكَ رَؤُوفٌ رَّحِيمٌ

আর এই সম্পদ তাদের জন্যে, যারা তাদের পরে আগমন করেছে। তারা বলেঃ হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদেরকে

এবং ঈমানে আগ্রহী আমাদের ভ্রাতাগণকে ক্ষমা কর এবং ঈমানদারদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে কোন বিদ্বেষ রেখো না।

হে আমাদের পালনকর্তা, আপনি দয়ালু, পরম করুণাময়। সুরা হাশর আয়াত :১০

পঞ্চম আয়াতঃ

وَالَّذِينَ آمَنُواْ مِن بَعْدُ وَهَاجَرُواْ وَجَاهَدُواْ مَعَكُمْ

فَأُوْلَـئِكَ مِنكُمْ وَأُوْلُواْ الأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَوْلَى بِبَعْضٍ فِي كِتَابِ اللّهِ

إِنَّ اللّهَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ

আর যারা ঈমান এনেছে পরবর্তী পর্যায়ে এবং ঘর-বাড়ী ছেড়েছে এবং তোমাদের সাথে সম্মিলিত হয়ে জেহাদ করেছে,

তারাও তোমাদেরই অন্তর্ভুক্ত। বস্তুতঃ যারা আত্নীয়, আল্লাহর বিধান মতে তারা পরস্পর বেশী হকদার।

নিশ্চয়ই আল্লাহ যাবতীয় বিষয়ে সক্ষম ও অবগত। সুরা আনফাল আয়াত :৭৫

ষষ্ট আয়াতঃ

لَقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ فَعَلِمَ مَا فِي قُلُوبِهِمْ

فَأَنزَلَ السَّكِينَةَ عَلَيْهِمْ وَأَثَابَهُمْ فَتْحًا قَرِيبًا

আল্লাহ মুমিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন, যখন তারা বৃক্ষের নীচে আপনার কাছে শপথ করল। আল্লাহ অবগত ছিলেন যা তাদের অন্তরে ছিল।

অতঃপর তিনি তাদের প্রতি প্রশান্তি নাযিল করলেন এবং তাদেরকে আসন্ন বিজয় পুরস্কার দিলেন। সুরা ফাতাহ আয়াত :১৮

সপ্তম আয়াতঃ

فَإِنْ آمَنُواْ بِمِثْلِ مَا آمَنتُم بِهِ فَقَدِ اهْتَدَواْ وَّإِن تَوَلَّوْاْ

فَإِنَّمَا هُمْ فِي شِقَاقٍ فَسَيَكْفِيكَهُمُ اللّهُ

وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ

অতএব তারা যদি ঈমান আনে, তোমাদের ঈমান আনার মত, তবে তারা সুপথ পাবে। আর যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়,

তবে তারাই হঠকারিতায় রয়েছে। সুতরাং এখন তাদের জন্যে আপনার পক্ষ থেকে আল্লাহই যথেষ্ট।

তিনিই শ্রবণকারী, মহাজ্ঞানী। সুরা বাকারা আয়াত :১৩৭

অষ্টম আয়াতঃ

يُبَشِّرُهُمْ رَبُّهُم بِرَحْمَةٍ مِّنْهُ وَرِضْوَانٍ وَجَنَّاتٍ لَّهُمْ فِيهَا نَعِيمٌ مُّقِيمٌ

তাদের সুসংবাদ দিচ্ছেন তাদের পরওয়ারদেগার স্বীয় দয়া ও সন্তোষের এবং জান্নাতের, সেখানে আছে তাদের জন্য স্থায়ী শান্তি।

সুরা তাওবা আয়াত :২১

নবম আয়াতঃ

جَزَاؤُهُمْ عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتُ عَدْنٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ

خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا رَّضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ

ذَلِكَ لِمَنْ خَشِيَ رَبَّهُ

তাদের পালনকর্তার কাছে রয়েছে তাদের প্রতিদান চিরকাল বসবাসের জান্নাত, যার তলদেশে নির্ঝরিণী প্রবাহিত।

তারা সেখানে থাকবে অনন্তকাল। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট।

এটা তার জন্যে, যে তার পালনকর্তাকে ভয় কর। সুরা বাইয়্যেনাহ আয়াত :৮

 

হাদিসের বর্ণনায় সাহাবায়ে কেরাম হকের মাপকাঠি হওয়ার প্রমাণ:

“ الله الله فى أصحابى لا تتخذوهم غرضا من بعدى

فمن أحبهم فبحبى أحبهم

ومن أبغضهم فببغضى أبغضهم

সাবধান ! তোমরা আমার সাহাবীগণের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। আমার পরে তোমরা তাঁদেরকে (তিরস্কারের) লক্ষ্যবস্তু বানাইও না।

যে ব্যক্তি তাঁদের প্রতি ভালোবাসা পোষণ করে সে আমার প্রতি ভালোবাসা বশেই তাঁদেরকে ভালোবাসে।

আর যে ব্যক্তি তাঁদের প্রতি শত্রুতা ও বিদ্বেষ পোষণ করে সে আমার প্রতি বিদ্বেষবশতঃ তাঁদের প্রতি শত্রুতা ও বিদ্বেষ পোষণ করে থাকে।

তিনি আরো ইরশাদ করেছেনঃ

 لاَ تَسُبُّوا أَصْحَابِى فَلَوْ أَنَّ أَحَدَكُمْ أَنْفَقَ مِثْلَ أُحُدٍ ذَهَبًا

مَا بَلَغَ مُدَّ أَحَدِهِمْ وَلاَ نَصِيفَهُ 

তোমরা আমার সাহাবীদেরকে গালি দিওনা। তোমাদের মধ্যে যদি কেহ উহুদ সমপরিমাণ স্বর্ণও যদি আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে,

তবেও তাঁদের এক মুদ্দ বা তার অর্ধেক পরিমাণ আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করার সমতূল্য হবেনা।

হযরত ইবনে আব্বাস(রাঃ)হতে বর্ণিতঃ রাসুলুলুল্লাহ(সঃ) ইরশাদ করেছেন

من سب اصحابي فعليه لعنة الله والملائكة والناس اجمعين 

যারা আমার সাহাবীদেরকে গালী দেয়, তাদের প্রতি আল্লাহর,ফেরেস্তাদের,এবং জগতবাসীর অভিশাপ বর্ষিত হোক।

উপরোল্লিখিত হাদিস সমুহ দ্বারা এ কথাই প্রমাণ হয় যে, সাহাবারা সত্যের মাপকাঠি। তাঁদের সর্ম্পকে কোন ধরনের সমালোচনা করা যাবেনা।

এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আক্বিদাও এটাই যে

الصحابة كلهم عدول

অর্থাৎ: সমস্ত সাহাবায়ে কেরাম সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত।

সুতারং এ পর্যন্ত প্রাপ্ত দলিলাদি দ্বারা এ কথা দিবালোকের মত স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, সাহাবায়ে কেরামগণ সমস্ত সমালোচনার উর্দ্ধে।

তাঁদের ব্যাপারে যারাই বিরুপ মন্তব্য করবে বুঝতে হবে তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের শত্রু।এর মধ্যে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু আমাদের সমাজে এমন দলও আছে,

যারা মুখে ইসলাম ও ইসলামী বিপ্লবের কথা বলে এবং সাহাবাদের সমালোচনা করতে কিঞ্চিত দ্বিধাবোধ করেনা। তাঁদের লেখনির মাধ্যমে উহা প্রকাশ পায়।

আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সাহাবায়ে কেরাম রাযি.দের মূল্য বুঝার, এবং তাদের হকসমূহ অনুধাবন করার এবং তা আদায়ে সচেষ্ট হওয়ার তাওফীক দান করুন। আমীন।

Facebook Comments