রোজার ইতিহাস : পার্ট ১ | রোজা সম্পর্কে আলোচনা | রোযার ফজিলত

রোজার ইতিহাস পার্ট ১
রোজার ইতিহাস : পার্ট ১ | রোজা সম্পর্কে আলোচনা | রোযার ফজিলত

রোজার ইতিহাস : পার্ট ১

রামাদান বা রমযান, রমজান শব্দটা এসেছে আরবি মূল রামিদা বা আর রামাদ থেকে, যার অর্থ প্রচণ্ড উত্তাপ কিংবা শুষ্কতা। ইসলামিক বর্ষপঞ্জিকা অনুসারে নবম মাস হলো রমজান মাস। রোজার ইতিহাস থেকে জানা যায় এই মাসেই বিশ্বব্যাপী মুসলিমরা রোজা পালন করে থাকেন।

রোযা বা রোজা, যার আরবি প্রতিশব্দ সাউম صوم বা সিয়াম। রমজান মাসে রোজা পালন ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে তৃতীয় স্তম্ভ। অন্য মাসের তুলনায় এ মাসে ইবাদতের সওয়াব বহুগুণে বেশী।

এই মাসেই নাজিল হয়েছিল পবিত্র কুরআন।

কোরআন নাজিলের রাতকে বলা হয় লাইলাতুল কদর। এই রাতে ইবাদত করলে কুরআনের ভাষা অনুযায়ী হাজার মাসের ইবাদতের থেকে বেশি সওয়াব পাওয়া যায়।

যেমন আল্লাহ কোরআনে ইরশাদ করেন:

إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ *  وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ *  لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ

সিয়ামের অর্থ কি শরিয়তের পরিভাষায়?

শরিয়তের পরিভাষায় সাওম বা সিয়াম হলো: সুবহে সাদেক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সকল প্রকার পানাহার,পাপাচার, স্ত্রী-সঙ্গম, অশ্লীলতা

এবং সেই সাথে যাবতীয় ভোগ-বিলাস, রোযা নষ্টকারী কাজ থেকেও বিরত থাকার নাম রোযা।

قال سفيان بن عيينة: الصوم هو الصبر، يصبر الإنسان على الطعام والشراب والنكاح،

ثم قرأ: إنما يوفى الصابرون أجرهم بغير حساب

ইসলামী বিধান অনুসারে, প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের জন্য রমযান মাসের প্রতি দিন রোজা রাখা ফরজ, فرض যার অর্থ অবশ্য পালনীয়।

সিয়াম শব্দের সাধারণ অর্থ হচ্ছে বিরত থাকা। তাইতো চুপ বা নিস্তব্ধ থাকাকে সিয়াম বলে।

আর যে ব্যক্তি চুপ থাকে তাকে সায়েম বলে। আল্লাহ তায়ালা হযরত মরিয়ম আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘটনা তুলে ধরে বর্ণনা করেন,

فَقُولِيٓ إِنِّي نَذَرۡتُ لِلرَّحۡمَٰنِ صَوۡمٗا فَلَنۡ أُكَلِّمَ ٱلۡيَوۡمَ إِنسِيّٗا

অর্থ : (সন্তান ভূমিষ্ঠের পর) যদি মানুষের মধ্যে কাউকে তুমি দেখ (কোনো প্রশ্ন বা কৈফিয়ত করতে) তবে তুমি বলো,

‘আমি দয়াময় আল্লাহর উদ্দেশে সাওম বা রোজা (কথা বলা থেকে বিরত থাকতে) মানত করছি।

সুতরাং আজ আমি কিছুতেই কোনো মানুষের সঙ্গে কথা বলবো না। (সুরা মারইয়াম : আয়াত ২৬)

কোরআন ও হাদিস থেকে রোজার ইতিহাস :

রোজার শুরু কবে থেকে সে সম্পর্কে ইতিহাস থেকে খুব বেশী জানা যায় না। অনেকে বলতে চান:

ইংল্যান্ডের বিখ্যাত দার্শনিক স্পেন্সার নিজের বই ‘প্রিন্সিপাল অফ সোশিয়লজি’ (Principles of Sociology)-তে

কতগুলো বন্য সম্প্রদায়ের উদাহরণ এবং জীব বৃত্তান্তের ওপর গবেষণা করে লিখেছেন যে,

রোজার প্রাথমিক মানদণ্ড এভাবেই হয়তো হয়ে থাকবে যে আদিম বন্য যুগের মানুষ স্বভাবতঃই ক্ষুৎ-পিপাসায় আক্রান্ত থাকতো এবং তারা মনে করতো যে,

আমাদের আহার্য বস্তু আমাদের পরিবর্তে এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মৃতদের নিকট পৌঁছে যায়। (এনসাইক্লোপেডিয়া অব ব্রিটানিকা )

কিন্তু তার ধারণা ঠিক নয়। কেননা তিনি যা বলেছেন সব অনুমান বিত্তিক। যা ইসলাম কখনো গ্রহণ করে না। এ ব্যপারে কোরআন বলে:

إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ 

তাই রোজার সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে কোরআন ও হাদিস থেকে যা জানা যায় তা হল:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ ءامَنُواْ كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَىٰ الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা আলুসি র. স্বীয় তাফসির গ্রন্থ ‘রুহুল মাআনি’তে উল্লেখ করেছেন যে, উপরোক্ত আয়াত

‘মিনকাবলিকুম’ দ্বারা হজরত আদম আ. থেকে শুরু করে হজরত ঈসা আ. পর্যন্ত সব নবী রসুলের জামানা বুঝানো হয়েছে।

মহান আল্লাহতায়ালা হজরত আদম (আ.)-কে জান্নাতে প্রেরণ করে একটি গাছের ফল খেতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে বিশেষ এক ধরনের রোজা রাখার নির্দেশ প্রদান করলেন।

এ ব্যাপারে দয়াময় আল্লাহতায়ালা মহাগ্রন্থ আল কোরআনে ইরশাদ করেন:

وَقُلْنَا يَا آدَمُ اسْكُنْ أَنتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ وَكُلَا مِنْهَا رَغَدًا حَيْثُ شِئْتُمَا وَلَا تَقْرَبَا هَٰذِهِ الشَّجَرَةَ فَتَكُونَا مِنَ الظَّالِمِينَ

হে আদম! তুমি এবং তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করতে থাক এবং সেখানে যা চাও, তা থেকে পরিতৃপ্তসহ খেতে থাক, কিন্তু তোমরা এ গাছের কাছে যেও না।

(যদি যাও বা তার ফল ভক্ষণ কর) তাহলে জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। (সূরা বাকারা, আয়াত-৩৫)।

মানব ইতিহাসের প্রথম রোজা।

মুফাসসিরে কেরাম বলেন, এটাই ছিল মানব ইতিহাসের প্রথম রোজা। হজরত আদম (আ.) ও হজরত হাওয়া (আ.) শয়তানের প্ররোচনার শিকার হয়ে ওই গাছের ফল ভক্ষণ করেছিলেন

এবং এর পরিণামে মহান আল্লাহতায়ালা তাদের ভূ-পৃষ্ঠে পাঠিয়ে দিলেন।

অতঃপর তারা উক্ত ভুলের জন্য যারপরনাই অনুতপ্ত হন, তওবা ইস্তিগফার করেন এবং এর কাফ্ফারাস্বরূপ ধারাবাহিক ৪০ বছর রোজা রেখেছিলেন।

হজরত আদম আ. এর পর অন্য সব নবী-রসুলের জামানায়ও রোজার বিধান ছিল। তবে তাদের রোজা পালনের পদ্ধতি ভিন্নতর ছিল।

হজরত নুহ (আ.) এর উপরও রোজা ফরজ ছিল; রসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, হজরত নুহ (আ.) ১ শাওয়াল ও ১০ জিলহজ ব্যতীত সারা বছর রোজা রাখতেন। (ইবনে মাজাহ)।

চলবে….

 

Facebook Comments