পীর বা মাজারে সিজদা করা সম্পর্কে ইসলাম কি বলে ? | Bangla Islam

পীর বা মাজারে সিজদা
পীর বা মাজারে সিজদা করা সম্পর্কে ইসলাম কি বলে Bangla Islam

পীর বা মাজারে সিজদা করা সম্পর্কে ইসলাম কি বলে

আল্লাহ তায়ালার দেওয়া সব চেয়ে বড় নিয়ামত মাথা। আর এ মাথা দ্বারা পীর বা মাজারে সিজদা করা নয় সেজদার একমাত্র মালিক বা হকদার মহান আল্লাহ তাআলা। আল্লাহ ব্যতিত অন্য কাওকে সিজদা জায়েয নেই।

বর্তমান সময়ে অনেককে বলতে শোনা যায় এবং বাস্তবে দেখা যায় একশ্রেণীর লোক ভক্তি-শ্রদ্ধার নামে পীরকে সেজদা করে। অনেকে আবার মাজারে বা দরগাহে সেজদায় লুটিয়ে পড়ে।

এ ধরণের পীর বা মাজারে সেজদাকারীরা শ্রদ্ধা-ভক্তির এ সেজদাকে জায়েজও বলে থাকেন। এবং তারা যুক্তি দেয়, আমরা যদি মসজিদে নামাজ পড়ি তাহলে সামনে দেওয়াল থাকে

এর মানে এই নয় যে আমরা দেওয়ালকে সিজদা করি। অনেক সময় সুন্নত নামাজ পড়ার সময় সামনে মানুষ বসে থাকে, এর মানে মানুষ কে সিজদা করছিনা।

যদি মানুষ এমন মনে করে পীর বা মাজারে সিজদা করতে থাকে তাহলে সে দিন বেশী দূরে নয় যখন মানুষ বলতে থাকবে মুর্তির সামনে সেজদা দেয়াও জায়েজ ।

কারণ তারা তখন বলবে আমরাত মুর্তিকে সেজদা করছি না, বরং আল্লাহকে সেজদা করছি।

এবার আমরা জানব পীর বা মাজারে সিজদা করা এবিষয়ে কুরআন-হাদীস কি বলে?

নিম্নে কুরআন-হাদীসের কয়েকটি দলিল উল্লেখ করা হল।

১। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:

وَأَنَّ الْمَسَاجِدَ لِلَّهِ فَلَا تَدْعُوا مَعَ اللَّهِ أَحَدًا

এবং এই ওহীও করা হয়েছে যে, মসজিদসমূহ আল্লাহ তা’আলাকে স্মরণ করার জন্য। অতএব, তোমরা আল্লাহ তা’আলার সাথে কাউকে ডেকো না। সুরা জ্বীন ৭২:১৮

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় প্রসিদ্ধ তাবেয়ী সায়ীদ ইবনে জুবায়ের, আতা, তলক ইবনে হাবীব প্রমুখ মুফাসসিরগণ বলেন, উক্ত আয়াতের সিজদার স্থানসমূহ দ্বারা উদ্দেশ্য সিজদার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ।

وَمَا يُؤْمِنُ أَكْثَرُهُمْ بِاللّهِ إِلاَّ وَهُم مُّشْرِكُونَ

অনেক মানুষ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, কিন্তু সাথে সাথে শিরকও করে।  সুরা ইউসুফ ১২:১০৬

অর্থাৎ এগুলোর মালিক আল্লাহ। অতএব এগুলো দ্বারা আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে সিজদা করো না।

সিজদার উপযুক্ত একমাত্র আল্লাহ তাআলা। উদ্দেশ্য যা-ই হোক না কেন, আল্লাহ তাআলা ছাড়া অন্য কাউকে সিজদা করা সম্পূর্ণ হারাম।
আর ইবাদতের উদ্দেশ্যে আল্লাহ ব্যতিত অন্য কাউকে সেজদা করলে সে মুশরিক হয়ে যাবে।

إِذْ قَالَ يُوسُفُ لِأَبِيهِ يَا أَبتِ إِنِّي رَأَيْتُ أَحَدَ عَشَرَ كَوْكَبًا وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ رَأَيْتُهُمْ لِي سَاجِدِينَ

যখন ইউসুফ পিতাকে বললঃ পিতা, আমি স্বপ্নে দেখেছি এগারটি নক্ষত্রকে। সুর্যকে এবং চন্দ্রকে। আমি তাদেরকে আমার উদ্দেশে সেজদা করতে দেখেছি। সুরা ইউসুফ ১২:৪

তাফসির : আলোচ্য আয়াতে বলা হয়েছে, হজরত ইউসুফ (আ.) স্বপ্নে দেখেছেন যে ১১টি নক্ষত্র, সূর্য ও চন্দ্র তাঁকে সিজদা করছে। এ সিজদাটি ছিল সম্মান ও মর্যাদাসূচক সিজদা।

এটা ইবাদত বা প্রার্থনার সিজদা নয়। আগের কোনো ধর্মে এমন সম্মানসূচক সিজদা বৈধ ছিল।

কিন্তু ইসলাম ধর্মে এমন তাজিমি বা সম্মানসূচক সিজদা বৈধ নয়।

হজরত ইউসুফ (আ.) এ বিষয়টি স্বপ্নে দেখেছেন। নবীদের স্বপ্ন সত্য।

এটিও এক ধরনের ওহি। ইউসুফ (আ.)-এর দেখা স্বপ্নে ১১টি নক্ষত্রের ব্যাখ্যা হলো তাঁর ১১ ভাই।

সূর্য ও চন্দ্রের ব্যাখ্যা হলো তাঁর পিতা-মাতা। অর্থাৎ তাঁরা সবাই একসময় তাঁর অনুগত হবেন। এটাই সব তাফসিরবিদের অভিমত।

আল্লাহ ছাড়া কারো জন্য সেজদা করার নিষিদ্ধতা সম্পর্কিত কয়েকটি হাদীস দেখা যেতে পারে।

হাদিস কি বলে পীর বা মাজারে সিজদা করা নিয়ে।

হযরত মুআজ বিন জাবাল রাঃ থেতে বর্ণিত। তিনি সিরিয়া গেলে সেখানকার খৃষ্টান অধিবাসী কর্তৃক পোপ ও পাদ্রীদেরকে সেজদা করতে দেখলেন।

হযরত মুআজ রাঃ বলেন, আমি তাদেরকে বললামঃ তোমরা কেন এমন কর? তারা উত্তরে বলল, এটাতো আমাদের পূর্ববর্তী নবীদের অভিবাদন ভক্তি ও সম্মান প্রকাশের মাধ্যম ছিল।

আমি [মুআজ] বললাম, তাহলে আমরা স্বীয় নবীকে এর প্রকারের ভক্তি প্রকাশের অধিক অধিকার রাখি।

সিরিয়া হতে প্রত্যাবর্তনের পর হযরত মুআজ রাঃ রাসূল সাঃ এর নিকট তাঁকে সেজদা করার অনুমতি চাইলে

তিনি ইরশাদ করেন, এরা খৃষ্টানরা স্বীয় নবীদের উপর মিথ্যারোপ করছে যে তাদের অভিবাদন সেজদা ছিল।। যেমন ওরা নিজেদের আসমানী কিতাবে বিকৃতি সাধন করেছে।

নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তাদের মনগড়া অভিবাদনের চাইতে অতি উত্তম অভিবাদন সালাম আমাদের দান করেছেন।

حَدَّثَنَا أَبُو الْيَمَانِ، قَالَ أَخْبَرَنَا شُعَيْبٌ، عَنِ الزُّهْرِيِّ، أَخْبَرَنِي عُبَيْدُ اللَّهِ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُتْبَةَ، أَنَّ عَائِشَةَ،

وَعَبْدَ اللَّهِ بْنَ عَبَّاسٍ، قَالاَ لَمَّا نَزَلَ بِرَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم

طَفِقَ يَطْرَحُ خَمِيصَةً لَهُ عَلَى وَجْهِهِ، فَإِذَا اغْتَمَّ بِهَا كَشَفَهَا عَنْ وَجْهِهِ، فَقَالَ وَهْوَ كَذَلِكَ

‏ “‏ لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الْيَهُودِ وَالنَّصَارَى اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ ‏”‏‏.‏ يُحَذِّرُ مَا صَنَعُوا‏.‏

আবূল ইয়ামান (রহঃ) …. উবায়দুল্লাহ ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু উতবা (রহঃ) থেকে বর্ণিত, আয়িশা ও আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেছেনঃ

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওফাত নিকটবর্তী হলে তিনি তাঁর একটা চাঁদরে নিজ মুখমণ্ডল আবৃত করতে লাগলেন।

যখন শ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হল, তখন মুখ থেকে চাঁদর সরিয়ে দিলেন।

এমতাবস্থায় তিনি বললেনঃ ইয়াহূদী ও নাসারাদের প্রতি আল্লাহর অভিশাপ,

তারা তাদের নবীদের (নবীদের) কবরকে মসজিদে পরিণত করেছে।

(এ বলে) তারা যে (বিদ’আতী) কার্যকলাপ করত তা থেকে তিনি সতর্ক করলেন।

হাদিস শরিফে এসেছে,

حَدَّثَنَا مَحْمُودُ بْنُ غَيْلاَنَ، حَدَّثَنَا النَّضْرُ بْنُ شُمَيْلٍ، أَخْبَرَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَمْرٍو، عَنْ أَبِي سَلَمَةَ،

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ “‏

لَوْ كُنْتُ آمِرًا أَحَدًا أَنْ يَسْجُدَ لأَحَدٍ لأَمَرْتُ الْمَرْأَةَ أَنْ تَسْجُدَ لِزَوْجِهَا ‏”‏

আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

আমি যদি কাউকে অন্য কোন লোকের প্রতি সিজদা করার নির্দেশ দিতাম তাহলে অবশ্যই স্ত্রীকে তার স্বামীর প্রতি সিজদা করার নির্দেশ দিতাম।

 

حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، وَإِسْحَاقُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، – وَاللَّفْظُ لأَبِي بَكْرٍ

قَالَ إِسْحَاقُ أَخْبَرَنَا وَقَالَ أَبُو بَكْرٍ، حَدَّثَنَا زَكَرِيَّاءُ بْنُ عَدِيٍّ، عَنْ عُبَيْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو،

عَنْ زَيْدِ بْنِ أَبِي أُنَيْسَةَ، عَنْ عَمْرِو بْنِ مُرَّةَ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ الْحَارِثِ النَّجْرَانِيِّ،

قَالَ حَدَّثَنِي جُنْدَبٌ، قَالَ سَمِعْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم قَبْلَ أَنْ يَمُوتَ بِخَمْسٍ وَهُوَ يَقُولُ ‏

“‏ إِنِّي أَبْرَأُ إِلَى اللَّهِ أَنْ يَكُونَ لِي مِنْكُمْ خَلِيلٌ فَإِنَّ اللَّهَ تَعَالَى قَدِ اتَّخَذَنِي خَلِيلاً كَمَا اتَّخَذَ إِبْرَاهِيمَ خَلِيلاً

وَلَوْ كُنْتُ مُتَّخِذًا مِنْ أُمَّتِي خَلِيلاً لاَتَّخَذْتُ أَبَا بَكْرٍ خَلِيلاً

أَلاَ وَإِنَّ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ كَانُوا يَتَّخِذُونَ قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ وَصَالِحِيهِمْ مَسَاجِدَ

أَلاَ فَلاَ تَتَّخِذُوا الْقُبُورَ مَسَاجِدَ إِنِّي أَنْهَاكُمْ عَنْ ذَلِكَ ‏”

হাদিসের অর্থঃ

আবূ বকর ইবনু আবূ শায়বাহ ও ইসহাক ইবনু ইবরাহীম (রহঃ) [শব্দাবলী আবূ বাকর এর] … জুনদুব (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,

আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মৃত্যুর পাঁচদিন পূর্বে তাকে বলতে শুনেছি যে, তোমাদের মধ্যে থেকে আমার কোন খলীল বা একান্ত বন্ধু থাকার ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছে মুক্ত।

কারণ মহান আল্লাহ ইবরাহীমকে যেমন খলীল বা একান্ত বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছেন,

সে রকমভাবে আমাকেও খলীল বা একান্ত বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

আমি আমার উম্মাতের মধ্য থেকে কাউকে খলীল বা একান্ত বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে চাইলে আবূ বকরকেই তা করতাম।

সাবধান থেকো তোমাদের পূর্বের যুগের লোকেরা তাদের নবী ও নেককার লোকদের কবরসমূহকে মাসজিদ (সাজদার স্থান) হিসেবে গ্রহণ করত।

সাবধান তোমরা কবরসমূহকে সাজদার স্থান বানাবে না।

আমি এরূপ করতে তোমাদেরকে নিষেধ করে যাচ্ছি।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে শুধুমাত্র তারই সেজদা করার তাওফিক দান করুন। গায়রুল্লাহর সেজদা থেকে হেফাজত করুন। শিরকমুক্ত ঈমানের অধিকারী হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

Facebook Comments

3 Trackbacks / Pingbacks

  1. কবরস্থ করার সুন্নত পদ্ধতি | এক কবরে কতজনকে দাপন? | Bangla Islam
  2. মৃত ব্যক্তির জন্য বর্জনীয় ও প্রচলিত বিদআত | Bangla Islam - বাংলা ইসলাম
  3. কবর পাকা করা কি গুনাহ? তাহলে রাসুলেরটা কেন? | Bangla Islam

Comments are closed.