নাভির নিচে হাত বাঁধা। নামাজে হাত বাধার সঠিক নিয়ম। Bangla Islam

নাভির নিচে হাত বাঁধা, নামাজে হাত বাধার সঠিক নিয়ম,Bangla Islam,
নাভির নিচে হাত বাঁধা। নামাজে হাত বাধার সঠিক নিয়ম। Bangla Islam

নাভির নিচে হাত বাঁধা

নামাযে দাঁড়িয়ে হাত কোথায় বাঁধাব। নাভির নিচে হাত বাঁধা নাকি বুকের উপর হাত বাঁধা এ নিয়ে আহলে হক উলামায়ে কেরাম গনের মাঝে যেমন মতনৈক্য আছে তেমনী ভাবে জন সাধারণের মাঝেও আছে। তাই এ নিয়ে কোরআন ও সহীহ হাদিস থেকে দলিল বিত্তিক কিছু আলোচনা করব ইনশা-আল্লাহ।

যে সমস্ত উলামায়ে কেরামগণ নাভীর নিচে হাত বাঁধার কথা বলেন তারা দলিল হিসাবে সাহাবী ও তাবেয়ীনের যুগ থেকে হাত বাঁধার যে দুটো নিয়ম চলে আসছে তা দিয়ে দলিল পেশ করেন।

অনুরুপ ভাবে যারা বুকের উপর হাত বাঁধার কথা বলেন তারাও দলিল হিসাবে সাহাবী ও তাবেয়ীনের যুগ থেকে হাত বাঁধার যে দুটো নিয়ম চলে আসছে তা দিয়ে দলিল পেশ করেন।

আর বিখ্যাত মুজতাহিদ ইমামগণও উল্লেখিত দুটো নিয়মই গ্রহণ করেছেন। যার উপর ভিত্ত্বি করে কিছু নামে আলেম হাত বাঁধার নতুন কিছু নিয়ম আবিষ্কার করেছেন,

নাভির নিচে হাত বাঁধা র আমল।

যা সাহাবা-তাবেয়ীনের যুগে ছিল না এবং কুরআন-সুন্নাহর প্রাজ্ঞ মনীষী ও মুজতাহিদগণের সিদ্ধান্তেও খুজে পাওয়া যায় না। বলাবাহুল্য,

এসব নতুন নিয়ম গুলো ‘শুযুয’ ও বিচ্ছিন্নতা বলে গণ্য, যা দ্বীন ও শরীয়তের বিষয়ে সম্পূর্ণ বর্জনীয়। কিন্তু দুঃখজনক কথা এই যে, সম্প্রতি এইসব বিচ্যুতি ও বিচ্ছিন্নতাকেই ‘সুন্নাহ’ বলে আখ্যায়িত করা হচ্ছে

এবং ব্যপক প্রচার প্রশার করে চরম দায়িত্বহীনতার সাথে জন-সাধারণকে গুমরাহ করা হচ্ছে। হক্কানী উলামায়ে কেরাম মনে করে,

সালামের গুরুত্ব ও ফজিলত | ইসলামে সালামের বিধান

সাধারণ মুসলমানদেরকে দলীল-প্রমাণের শাস্ত্রীয় জটিলতার মুখোমুখি করা অনুচিত, কিন্তু এ সকল বর্জনীয় বিষয়ের প্রতিরোধ ও আম মানুষকে বিভ্রান্তি থেকে রক্ষার জন্য

এর কিছু বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনার বিকল্প নেই। যথাসম্ভব সহজ ভাষায় আমরা তা উপস্থাপনের চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে বুঝার তাওফীক দান করুন। আমীন।

নামাযে হাত বাঁধার অগ্রহযোগ্য কয়েকটি নিয়ম  উল্লেখ করা হল।

অগ্রহযোগ্য নিয়ম ১ : বুকের উপরের অংশে থুতনীর নিচে হাত রাখা।

সমসাময়িক গায়রে মুকাল্লিদ আলিমরাও এই নিয়মকে খন্ডন করেছেন। যেমন শায়খ বকর বিন আবদুল্লাহ আবু যায়েদ ‘‘লা জাদীদা ফী আহকামিস সালাহ’’ পুস্তিকায় এ নিয়মটিকে খন্ডন করেছেন।

ভূমিকায় তিনি লেখেন, ‘আমরা দেখেছি, কিছু লোক শায ও বিচ্ছিন্ন মত গ্রহণ করে তার প্রচারে তার সর্বশক্তি ব্যয় করছে। এদের খন্ডনের জন্য মনীষী আলিমদের নীতিই যথেষ্ট।

বুকের উপরের অংশে থুতনীর নিচে হাত বাঁধার ‘দলীল’ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘এটা কুরআন মজীদের আয়াত-

 فَصَلِّ لِرَبِّکَ وَ انۡحَرۡ

অতএব তোমার রবের উদ্দেশ্যেই সালাত পড় এবং নহর কর। আল-কাউসার : ২

এ আয়াত দ্বারা তারা নাভির নিচে হাত বাঁধা এর মাসআলাকে রদ করতে চায়।

এর তাফসীরে আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. থেকে বর্ণনা করা হয়। বায়হাকী তা বর্ণনা করেছেন এবং তার সূত্রে তাফসীরের বিভিন্ন কিতাবে তা বর্ণিত হয়েছে। দেখুন : আদ্দুররুল মানছূর ৮/৬৫০-৬৫১

‘এই রেওয়ায়েত সহীহ নয়। সূরায়ে কাওসারের ঐ আয়াতের তাফসীর সম্পর্কে সঠিক কথা এই যে, তার অর্থও তা-ই যা নিম্নোক্ত আয়াতে বলা হয়েছে-

قل ان صلاتى ونسكى ومحياى ومماتى لله رب العالمين

বল, আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ আল্লাহর জন্য, যিনি রাববুল আলামীন।’

অর্থাৎ ঐ আয়াতে وانحر অর্থ কুরবানী, গলদেশে হাত রাখা নয়। সারকথা : এই রেওয়ায়েত নির্ভরযোগ্য নয়। আর এর দ্বারা উপরোক্ত আয়াতের তাফসীর করা তো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

আয়াতের সঠিক তাফসীর তা-ই যা ইবনে জারীর তাবারী রাহ. গ্রহণ করেছেন এবং ইবনে কাছীর যাকে ‘অতি উত্তম’ বলেছেন।

অগ্রহযোগ্য নিয়ম ২ : নামাযে যিরার উপর যিরা রাখা।

আরবীতে হাতের আঙুলের মাথা থেকেই কনুই পর্যন্ত অংশকে ‘যিরা’ বলে। যাকে বাংলায় হাত বলে থাকি। বর্তমানে কিছু মানুষ যিরার উপর যিরা রাখাকে সুন্নাহ মনে করেন।

এবং তারা ডান হাতের যিরা বাম হাতের যিরার উপর রাখেন। হাত বাঁধার ক্ষেত্রে এটাও একটা বিভ্রান্তিকর মতবাদ। কোনো সহীহ হাদীসে যিরার উপর যিরা রাখার কথা নেই।

জিলহজের প্রথম ১০ দিন যাতে রয়েছে ৫টি বিশেষ আমল

এবং সাহাবা-তাবেয়ীনের যুগেও ছিল না এবং কোনো মুজতাহিদ ইমাম এই নিয়মের কথা বলেননি। যারা একে সুন্নাহ মনে করেন তারা এ বিষয়ে কোনো সহীহ হাদিস উপস্থাপন করতে পারেননি।

বরং দুইটি সহীহ হাদীসের ভুল ব্যাখ্যা করে তা প্রমান করতে চেয়েছে। এ সম্পর্কে আলোচনা হল এই।

প্রথম হাদীস :

সাহল ইবনে সাদ রা. থেকে বর্ণিত, ‘লোকদেরকে আদেশ করা হত, পুরুষ যেন তার ডান হাত বাম যিরার উপর রাখে….

حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مَسْلَمَةَ، عَنْ مَالِكٍ، عَنْ أَبِي حَازِمٍ، عَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ،

قَالَ كَانَ النَّاسُ يُؤْمَرُونَ أَنْ يَضَعَ الرَّجُلُ الْيَدَ الْيُمْنَى عَلَى ذِرَاعِهِ الْيُسْرَى فِي الصَّلاَةِ‏

.‏ قَالَ أَبُو حَازِمٍ لاَ أَعْلَمُهُ إِلاَّ يَنْمِي ذَلِكَ إِلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم‏

.‏ قَالَ إِسْمَاعِيلُ يُنْمَى ذَلِكَ‏.‏ وَلَمْ يَقُلْ يَنْمِي‏.‏

আবদুল্লাহ ইবনু মাসলামা (রহঃ) … সাহল ইবনু সা’দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, লোকদের নির্দেশ দেওয়া হত যে,

সালাতে প্রত্যেক ডান হাত বাম হাতের কবজির উপর রাখবে। আবূ হাযিম (রহঃ) বলেন, সাহল (রহঃ) এ হাদীসটি

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করতেন বলেই জানি। ইসমায়ীল (রহঃ) বলেন, এ হাদীসটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকেই বর্ণনা করা হত।

তবে তিনি এরূপ বলেন নি যে, সাহল (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করতেন।

এই হাদীসে যিরার উপর যিরা রাখার কথা নেই। বাম যিরার উপর ডান হাত রাখার কথা আছে।

দ্বিতীয় হাদীস :

ওয়াইল ইবনে হুজর রা. থেকে বর্ণিত হাদীসের একটি পাঠ। তাতে আছে, ‘(আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর ডান হাত বাম হাতের পাতা, কব্জি ও যিরার উপর রাখলেন।’

حَدَّثَنَا الْحَسَنُ بْنُ عَلِيٍّ، حَدَّثَنَا أَبُو الْوَلِيدِ، حَدَّثَنَا زَائِدَةُ، عَنْ عَاصِمِ بْنِ كُلَيْبٍ،

بِإِسْنَادِهِ وَمَعْنَاهُ قَالَ فِيهِ ثُمَّ وَضَعَ يَدَهُ الْيُمْنَى عَلَى ظَهْرِ كَفِّهِ الْيُسْرَى

وَالرُّسْغِ وَالسَّاعِدِ وَقَالَ فِيهِ ثُمَّ جِئْتُ بَعْدَ ذَلِكَ فِي زَمَانٍ فِيهِ بَرْدٌ شَدِيدٌ

فَرَأَيْتُ النَّاسَ عَلَيْهِمْ جُلُّ الثِّيَابِ تَحَرَّكُ أَيْدِيهِمْ تَحْتَ الثِّيَابِ ‏.‏

আল-হাসান ইবনু আলী ….. আসেম থেকে এই সূত্রে উপরোক্ত হাদীছের অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে। রাবী বলেন,

অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় ডান হাত দ্বারা বাম হাতের কব্জি ও এর জোরে আকড়িয়ে ধরেন।

রাবী বলেন, অতঃপর আমি কিছুদিন পর সেখানে গিয়ে দেখতে পাই যে, সাহাবায়ে কিরাম অত্যধিক শীতের কারণে শরীর আবৃত করে রেখেছেন।

এবং তাদের হাতগুলো স্ব-স্ব কাপড়ের মধ্যে নড়াচড়া করছে।

এই বর্ণনাতেও বলা হয়নি ডান যিরা রেখেছেন। বলা হয়েছে, ডান হাত রেখেছেন। এই দুই হাদীসে ডান হাত অর্থ ডান হাতের যিরা-এর কোনো প্রমাণ নেই।

কারণ হাদীস ও ফিকহের নির্ভরযোগ্য কোনো ইমামও এই ব্যাখ্যা করেননি।

অগ্রহযোগ্য নিয়ম ৩ : বুকের উপর হাত বাঁধাকে একমাত্র সুন্নাহ মনে করা।

কোন সাহাবা বা তাবেয়ীন থেকে সহীহ মরফূ হাদীসে বুকের উপর হাত বাঁধার নিয়ম পাওয়া যায় না। এবং কোনো মুজতাহিদ থেকেও নিখুঁত বর্ণনায় এই নিয়ম পাওয়া যায় না।

কিছু শায ও মুনকার রেওয়ায়েত পাওয়া যায়, যেগুলো হাদীস হিসেবে প্রমাণিত নয়। এ ধরনের একটি মতকে একমাত্র সুন্নাহ মনে করা যে মারাত্মক বিভ্রান্তি তাতে কোন সন্দেহ নেই।

তারা বুকের উপর হাত বাঁধা প্রমাণ করতে গিয়ে যেসব রেওয়ায়েতের সহযোগিতা নিয়েছে তা হল:

মুয়াম্মাল ইবনে ইসমাইলের রেওয়ায়েত: তাঁর বিবরণ অনুযায়ী সুফিয়ান ছাওরী রাহ…… ওয়াইল ইবনে হুজর রা. থেকে বর্ণনা করেছেন,

‘আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে নামায পড়লাম …

أخبرنا أبو طاهر، نا أبو بكر، نا أبو موسى، نا مؤمل، نا سفيان،

عن عاصم بن كليب، عن أبيه، عن وائل بن حجر قال :

صليت مع رسول الله صلى الله عليه وسلم، ووضع يده اليمنى على يده اليسرى على صدره.

সুফিয়ান ছাওরী রাহ…… ওয়াইল ইবনে হুজর রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, ‘আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-

এর সাথে নামায পড়লাম … তিনি তাঁর ডান হাত বাম হাতের উপর বুকের উপর রাখলেন। সহীহ ইবনে খুযায়মা ১/২৭২, হাদীস : ৪৭৯

নাভির নিচে হাত বাঁধা এর বিরদ্ধে যে দলিল গুলো পেশ করছে তা ভুল।

মুয়াম্মাল ইবনে ইসমাইলের পূর্ণ বিবরণ সঠিক নয়। হাদীস শাস্ত্রের নীতি অনুসারে এ বর্ণনায় على صدره ‘বুকের উপর’ কথাটা ‘মুনকার’। অর্থাৎ সুফিয়ান ছাওরী রাহ.-এর বর্ণনায় তা ছিল না।

মুয়াম্মাল ইবনে ইসমাইল ভুলক্রমে তা বাড়িয়ে দিয়েছেন। কারণ সুফিয়ান ছাওরী রাহ. থেকে এই হাদীস মুহাম্মাদ ইবনে ইউসুফ ফিরয়াবী ও আবদুল্লাহ ইবনুল ওয়ালীদ রাহ.ও বর্ণনা করেছেন।

তাঁরা দু’জনই ছিকা ও শক্তিশালী রাবী। তাঁদের রেওয়ায়েতে على صدره ‘বুকের উপর’ কথাটা নেই। দেখুন : মুসনাদে আহমদ ৪/৩১৮; আলমুজামুল কাবীর তবারানী ২২/৩৩

ইসলামের দৃষ্টিতে মিথ্যা কথা বলা ও মিথ্যা বলার পরিণতি

রেওয়ায়েত দুটির সনদসহ আরবী পাঠ নিম্নরূপ :

قال الإمام أحمد : حدثنا عبد الله بن الوليد، حدثني سفيان،

عن عاصم بن كليب عن أبيه عن وائل بن حجر قال : … ورأيته ممسكا بيمينه على شماله في الصلاة …

وقال الإمام الطبراني : حدثنا عبد الله بن محمد بن سعيد بن أبي مريم

ثنا محمد بن يوسف الفريابي حدثنا سفيان عن عاصم بن كليب عن أبيه عن وائل بن حجر

قال : رأيت النبي صلى الله عليه وسلم يضع يده اليمنى على اليسرى وإذا جلس افترش رجله اليسرى …

এটা শুধু পাওয়া যায় মুয়াম্মাল ইবনে ইসমাইল রাহ.-এর বর্ণনায়, যাঁর সম্পর্কে জারহ-তাদীলের ইমামদের সিদ্ধান্ত এই যে, তিনি সাধারণভাবে বিশ্বস্ত ও সত্যবাদী হলেও রেওয়ায়েতের ক্ষেত্রে তাঁর প্রচুর ভুল হয়েছে।

এমনকি ইমাম বুখারী রাহ. তাকে ‘মুনকাররুল হাদীস’ বলেছেন।ইমামগণের মন্তব্য নীচে উল্লেখ করা হল-

قال البخاري : منكر الحديث

وقال: أبو حاتم الرازي : صدوق شديد في السنة كثير الخطأ، يكتب حديثه

وقال أبو زرعة الرازي : في حديثه خطأ كثير,

وقال-ابن سعد : ثقة كثير الغلط’

و قال الساجي : صدوق، كثير الخطأ وله أوهام يطول ذكرها

وقال الدارقطني : ثقة كثير الخطأ-

দেখুন : তাহযীবুল কামাল ১৮/৫২৬; তাযীবুত তাহযীব ১০/৩৪০; মীযানুল ইতিদাল ৮৯৪৯; আলমুগনী ফী যুআফা ৬৫৪৭

শায়খ আলবানীও সিলসিলাতুয যয়ীফার অনেক জায়গায় তাঁকে জয়ীফ বলেছেন এবং তাঁর সম্পর্কে ইমামগণের মন্তব্য উদ্ধৃত করেছেন।

মোটকথা, এ রেওয়ায়েতেও على صدره বুকের উপর কথাটা ‘শায’ বা মুসাহহাফ, যা পরিত্যক্ত।

সব চেয়ে মজার কথা এই যে, তারা যে রেওয়ায়েত প্রমাণ হিসেবে করে সে হাদীসেরই রাবী ইমাম সুফিয়ান ছাওরী রাহ.। এই হাদীসের বিশুদ্ধ বর্ণনায় على صدره থাকলে

অবশ্যই তিনি বুকের উপর হাত বাঁধাকে সুন্নাহ মনে করতেন এবং বুকের উপর হাত বাঁধতেন। কিন্তু তিনি হাত বাঁধতেন নাভীর নিচে, বুকের উপর নয়। দেখুন : আলমুগনী ইবনে কুদামা ২/১৪১; আলমাজমূ শরহুল মুহাযযাব ৪/৩৩০

রেওয়ায়েতসমূহের পর্যালোচনা থেকে যা পাওয়া গেল তা এই-

তাদের দলিলের প্রথম রদ।

ওয়াইল ইবনে হুজর রা. থেকে বর্ণিত হাদীসের বিশুদ্ধ বর্ণনায় على صدره নেই। কারণ সুফিয়ান ছাওরী রাহ. থেকে দু’জন শক্তিশালী রাবী

আবদুল্লাহ ইবনুল ওয়ালীদ ও মুহাম্মাদ ইবনে ইউসুফ এবং সুফিয়ান ছাওরীর উস্তাদ আসিম ইবনে কুলাইব থেকে

অন্তত ১১জন ইমাম ও ছিকা রাবী এই হাদীসের হাত বাঁধার বিবরণ বর্ণনা করেছেন। তাঁদের কারো বর্ণনায় على صدره নেই।

একমাত্র মুয়াম্মাল ইবনে ইসমাঈলের বর্ণনায় এটা পাওয়া যায়, যার বর্ণনার ভুল-ভ্রান্তি সম্পর্কে জারহ-তাদীলের ইমামগণ বিশেষভাবে সাবধান করেছেন।

এ কারণে হাদীসশাস্ত্রের মূলনীতি অনুযায়ী তাঁর বর্ণনার অতিরিক্ত অংশটি ‘মুনকার’ ও অগ্রহণযোগ্য।

তাদের দলিলের দ্বিতীয় রদ।

হুলব রা. থেকে বর্ণিত হাদীসের বিশুদ্ধ বর্ণনাতেও على صدره নেই। শুধু মুসনাদে আহমদে ও যেসব কিতাবে মুসনাদে আহমদের সূত্রে হাদীসটি বর্ণনা করা হয়েছে

সেইগুলোতেই হাদীসটি على صدره সহ পাওয়া যায়। এই হাদীসের অন্যান্য বর্ণনার সাথে তুলনা করলে

এমনকি মুসনাদে আহমদের বর্ণনাটিও গভীরভাবে পাঠ করলে প্রতীয়মান হয় এই হাদীসের বিশুদ্ধ বর্ণনায় على صدره নেই।

তাদের দলিলের তৃতীয় রদ।

সূরা কাউসারের তাফসীরে হযরত আলী রা. থেকে যে রেওয়ায়েত বর্ণনা করা হয় তা দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।

সনদ-মতন দুদিক থেকেই তা ‘মুযতারিব’। এই হাদীসের على صدره ওয়ালা রেওয়ায়েতটিকে কোনোভাবেই অগ্রগণ্য সাব্যস্ত করা যায় না।

শায়খ আলবানী সনদের ইযতিরাব স্বীকার করেছেন, কিন্তু মতনের ইযতিবাব খন্ডন করতে গিয়ে এমন কিছু কাজ করেছেন, যা দুঃখজনক।

তাদের দলিলের চতুর্থ রদ।

সুলায়মান ইবনে মুসার সূত্রে বর্ণিত যে মুরসাল রেওয়ায়েতটি উদ্ধৃত করা হয়, তাউস রাহ. পর্যন্ত এর সনদ

মোটামুটি গ্রহণযোগ্য হলেও তা অন্তত দুটো কারণে ‘মা’লূল’। সুতরাং তা দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।

নাভির নিচে হাত বাঁধা এর দলিল সমূহ।

হানাফী মাজহাবের প্রথম দলিল:

حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ مَحْبُوبٍ، حَدَّثَنَا حَفْصُ بْنُ غِيَاثٍ، عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ إِسْحَاقَ، عَنْ زِيَادِ بْنِ زَيْدٍ،

عَنْ أَبِي جُحَيْفَةَ، أَنَّ عَلِيًّا، قَالَ السُّنَّةُ وَضْعُ الْكَفِّ عَلَى الْكَفِّ فِي الصَّلَاةِ تَحْتَ السُّرَّةِ ‏.‏

আবূ জুহাইফাহ্ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। ‘আলী (রাঃ) বলেছেন, সালাত আদায়কালে বাম হাতের তালুর উপর ডান হাতের তালু নাভীর নীচে রাখা সুন্নাত।

সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) – হাদিস নম্বরঃ ৭৫৬

দোয়া কবুলের শর্ত সমূহ | আমল কবুলের শ্রেষ্ঠ সময়

হানাফী মাজহাবের দ্বিতীয় দলিল:

حَدَّثَنَا عَبْدُ اللهِ، حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ سُلَيْمَانَ الْأَسَدِيُّ لُوَيْنٌ، حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ أَبِي زَائِدَةَ،

حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ إِسْحَاقَ، عَنْ زِيَادِ بْنِ زَيْدٍ السُّوَائِيِّ، عَنْ أَبِي جُحَيْفَةَ، عَنْ عَلِيٍّ،

قَالَ: إِنَّ مِنَ السُّنَّةِ فِي الصَّلاةِ وَضْعُ الْأَكُفِّ، عَلَى الْأَكُفِّ تَحْتَ السُّرَّةِ

আলী (রাঃ) বলেছেন, নামাযে এক হাতের ওপর আর এক হাত রেখে নাভির নিচে রাখা সুন্নত। মুসনাদে আহমাদ – হাদিস নম্বরঃ ৮৭৫

হানাফী মাজহাবের তৃতীয় দলিল:

حَدَّثَنَا يَعْقُوبُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ الْبَزَّازُ ، ثَنَا الْحَسَنُ بْنُ عَرَفَةَ ، نَا أَبُو مُعَاوِيَةَ ،

عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ إِسْحَاقَ ، ح : وَحَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ الْقَاسِمِ بْنِ زَكَرِيَّا الْمُحَارِبِيُّ ،

ثَنَا أَبُو كُرَيْبٍ ، ثَنَا يَحْيَى بْنُ أَبِي زَائِدَةَ ، عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ إِسْحَاقَ ،

ثَنَا زِيَادُ بْنُ زَيْدٍ السُّوَائِيُّ ، عَنْ أَبِي جُحَيْفَةَ ، عَنْ عَلِيٍّ – رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ –

قَالَ : ” إِنَّ مِنَ السُّنَّةِ فِي الصَّلَاةِ وَضْعَ الْكَفِّ عَلَى الْكَفِّ تَحْتَ السُّرَّةِ

ইয়াকূব ইবনে ইবরাহীম আল-বাযযার (রহঃ) … আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নামাযের মধ্যে (দাঁড়ানো অবস্থায়)

নাভির নিচে এক হাতের তালু অপর হাতের তালুর উপর রাখা সুন্নাত তরীকার অন্তর্ভুক্ত। সুনান আদ-দারাকুতনী – হাদিস নম্বরঃ ১০৭৫

হানাফী মাজহাবের চতুর্থ দলিল:

حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ الْقَاسِمِ ، ثَنَا أَبُو كُرَيْبٍ ، ثَنَا حَفْصُ بْنُ غِيَاثٍ ، عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ إِسْحَاقَ ،

عَنِ النُّعْمَانِ بْنِ سَعْدٍ ، عَنْ عَلِيٍّ ؛ أَنَّهُ كَانَ يَقُولُ : ” إِنَّ مِنْ سُنَّةِ الصَّلَاةِ وَضْعَ الْيَمِينِ عَلَى الشِّمَالِ تَحْتَ السُّرَّةِ

মুহাম্মাদ ইবনুল কাসেম (রহঃ) … আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলতেন, নামাযের সুন্নাত তরীকা হলো নাভির নিচে বাম হাতের উপর ডান হাত রাখা।

সুনান আদ-দারাকুতনী – হাদিস নম্বরঃ ১০৭৬

আল্লাহ আমাদের সকলকে উল্লেখিত আয়াত ও হাদিস সমূহের আলোকে নিজেদের জীবনে সুন্নত তরীকায় নামায পড়ার তাওফিক দান করুক। আমিন।

মাও. ইবরাহিম মোস্তফা
মাও. ইবরাহিম মোস্তফা

 

Facebook Comments

1 Trackback / Pingback

  1. কুরবানীর গোশত পারিশ্রমিক হিসেবে প্রদান যায়েজ কিনা । Bangla Islam

Comments are closed.