নবীর প্রতি ভালোবাসা কেমন হওয়া উচিৎ এবং কি ভাবে প্রকাশ করবেন।

নবীর প্রতি ভালোবাসা
নবীর প্রতি ভালোবাসা কেমন হওয়া উচিৎ এবং কি ভাবে প্রকাশ করবেন।

নবীর প্রতি ভালোবাসা

যখন কেহ বলে আমি মুসলমান তখন তার এ দাবি বুঝায় সে ইসলামের সকল বিষয়ের প্রতি ঈমান এনেছে। আর ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নবীর প্রতি ভালোবাসা। কেননা নবীর প্রতি ভালোবাসা যার থেকে পরিপূর্ণ প্রকাশ পাবে না সে সত্যিকারে মুমিন হতে পারবে না।

হাদীস শরীফে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ الْمُثَنَّى…عَنْ أَنَسٍ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم صلى الله عليه وسلم قَالَ

‏ ثَلاَثٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ وَجَدَ حَلاَوَةَ الإِيمَانِ أَنْ يَكُونَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا،

وَأَنْ يُحِبَّ الْمَرْءَ لاَ يُحِبُّهُ إِلاَّ لِلَّهِ، وَأَنْ يَكْرَهَ أَنْ يَعُودَ فِي الْكُفْرِ كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُقْذَفَ فِي النَّارِ ‏‏.‏

মুহাম্মদ ইবনুল মূসান্না (রহঃ) … আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ

তিনটি গুণ যার মধ্যে থাকে, সে ঈমানের স্বাদ পায়। ১। আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল তার কাছে অন্য সব কিছুর থেকে প্রিয় হওয়া;

২। কাউকে খালিস আল্লাহ্‌র জন্যই মুহব্বত করা; ৩। কুফ্‌রীতে ফিরে যাওয়াকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মত অপছন্দ করা।

ইসলাম গ্রহন যদি খাঁটি ও আন্তরিক না হয় বরং বাহ্যিক লোক দেখানো আনুগত্য প্রদর্শনের জন্য বা হত্যার ভয়ে হয়। তবে কোরআনের ভাষায় তাকে মুমিন বলা যাবে না।

যেমন কোরআনে বর্ণিত রয়েছে:

قَالَتِ الْأَعْرَابُ آمَنَّا قُل لَّمْ تُؤْمِنُوا وَلَكِن قُولُوا أَسْلَمْنَا

وَلَمَّا يَدْخُلِ الْإِيمَانُ فِي قُلُوبِكُمْ وَإِن تُطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ لَا يَلِتْكُم مِّنْ أَعْمَالِكُمْ شَيْئًا

إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

মরুবাসীরা বলেঃ আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি। বলুনঃ তোমরা বিশ্বাস স্থাপন করনি; বরং বল, আমরা বশ্যতা স্বীকার করেছি।

এখনও তোমাদের অন্তরে বিশ্বাস জন্মেনি। যদি তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য কর, তবে তোমাদের কর্ম বিন্দুমাত্রও নিস্ফল করা হবে না।

নিশ্চয়, আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম মেহেরবান। সুরা হুজুরাত ৪৯:১৪

হাদিসে নবীর প্রতি ভালোবাসা এর বর্ণনা।

হাদিসের মাঝে এসেছে তোমরা কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হবে না, যতক্ষণ আমি তার কাছে তার বাবা, তার সন্তান ও সকল মানুষের চেয়ে প্রিয় না হব।

حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ بَشَّارٍ…عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ ‏

لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَلَدِهِ وَوَالِدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ ‏.‏

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

আমি তোমাদের কারো কাছে তার সন্তান-সন্ততি, তার পিতা-মাতা ও সকল মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় না হওয়া পর্যন্ত সে (পূর্ণ) মুমিন হতে পারবে না।

নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ভালোবাসা ঈমান ও ইসলামের একটি মানদন্ড, এই মানদন্ডের মাধ্যমে প্রত্যেকে নিজ নিজ ঈমান যাচাই করে নিতে পারেন।

অন্তরে যদি তাঁর প্রতি মহব্বত ও ভালোবাসা অনুভব হয় তাহলে বুঝতে হবে তার মাঝে ঈমানের অংশ রয়েছে। সাথে সাথে আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া আদায় করা যে,

আল্লাহ তার মাঝে ঈমানের একটি বৈশিষ্ট্য দান করেছেন। অন্যথায় নিজের ব্যাপারে সতর্ক হওয়া উচিৎ। যেমন কোরআনে বর্ণিত রয়েছে:

لَئِن شَكَرْتُمْ لأَزِيدَنَّكُمْ وَلَئِن كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ

যদি কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর, তবে তোমাদেরকে আরও দেব এবং যদি অকৃতজ্ঞ হও তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি হবে কঠোর। সুরা ইবরাহীম ১৪:৭

যে নবীর প্রতি ভালোবাসা দেখাল ইহকাল ও পরকালের শান্তির পথ।

মুমিন কি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে না ভালোবেসে পারে? যাঁর মাধ্যমে মানবজাতি পেল ঈমান ও কোরআনের মতো মহাসম্পদ, লাভ করল মুমিন হওয়ার মহাসৌভাগ্য,

যিনি আমাদের দেখালেন ইহকাল-পরকালের শান্তির পথ। যেমন কোরআনে বর্ণিত রয়েছে:

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ شَاهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا

হে নবী! আমি আপনাকে সাক্ষী, সুসংবাদ দাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি। [ সুরা আহযাব ৩৩:৪৫

وَدَاعِيًا إِلَى اللَّهِ بِإِذْنِهِ وَسِرَاجًا مُّنِيرًا

এবং আল্লাহর আদেশক্রমে তাঁর দিকে আহবায়করূপে এবং উজ্জ্বল প্রদীপরূপে। [ সুরা আহযাব ৩৩:৪৬

وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ بِأَنَّ لَهُم مِّنَ اللَّهِ فَضْلًا كَبِيرًا

আপনি মুমিনদেরকে সুসংবাদ দিন যে, তাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বিরাট অনুগ্রহ রয়েছে। [ সুরা আহযাব ৩৩:৪৭

আর সেই পথ দেখাতে গিয়ে যাঁর রক্ত ঝরল, দান্দান মোবারক শহীদ হলো, এরপরও আল্লাহর দরবারে উম্মতের নাজাত ও হেদায়েত প্রার্থনা করে অশ্রু ঝরালেন- তাঁকে তো ভালোবাসতেই হবে।

যিনি মানুষকে দিলেন মনুষ্যত্বের শিক্ষা, মূর্খ, বর্বর মানুষ গুলোকে পরিণত করলেন সোনার মানুষে, তার সামনে উন্মুক্ত করলেন বিশ্বাস ও কর্মের এক উন্নত জগৎ,

উন্মোচিত করলেন প্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে বিশ্বাস ও চেতনার সুপ্ত সম্ভাবনাকে। এককথায় যিনি মানবকে দেখালেন তার মানব-জন্ম সার্থক হওয়ার পথ।

তাঁকে তো ভালোবাসতেই হবে।

পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে:

وَاعْبُدُواْ اللّهَ وَلاَ تُشْرِكُواْ بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا

وَبِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَى وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالجَنبِ وَابْنِ السَّبِيلِ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ

إِنَّ اللّهَ لاَ يُحِبُّ مَن كَانَ مُخْتَالاً فَخُورًا

আর উপাসনা কর আল্লাহর, শরীক করো না তাঁর সাথে অপর কাউকে। পিতা-মাতার সাথে সৎ ও সদয় ব্যবহার কর

এবং নিকটাত্নীয়, এতীম-মিসকীন , প্রতিবেশী, অসহায় মুসাফির এবং নিজের দাস-দাসীর প্রতিও।

নিশ্চয়ই আল্লাহ পছন্দ করেন না দাম্ভিক-গর্ বিতজনকে। সুরা নিসা ৪:৩৬

ঈমানের শিক্ষায় মানুষ পরিশুদ্ধ হয়, পরিশীলিত হয়। তার চিন্তা-ভাবনা, আবেগ-অনুভূতি, উদ্যম-উদ্দীপনা সঠিক ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।

তার যোগ্যতা ও সক্ষমতা তাকে সঠিক গন্তব্যের দিকে পরিচালিত করে।

মানুষের আবেগ-অনুভূতিও তার এক শক্তি। এই শক্তি সঠিক ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হলে এর দ্বারা ‘অসাধ্য’ সাধন হতে পারে।

অন্যদিকে ভুল ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ সমাজকে অবক্ষয়-অরাজকতার নরকে পরিণত করতে পারে।

তাদের মুখমন্ডলে রয়েছে সেজদার চিহ্ন ।

যেমন কোরআনে বর্ণিত আছে:

مُّحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاء عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاء بَيْنَهُمْ

تَرَاهُمْ رُكَّعًا سُجَّدًا يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِّنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِم مِّنْ أَثَرِ السُّجُودِ

ذَلِكَ مَثَلُهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَمَثَلُهُمْ فِي الْإِنجِيلِ كَزَرْعٍ أَخْرَجَ شَطْأَهُ

فَآزَرَهُ فَاسْتَغْلَظَ فَاسْتَوَى عَلَى سُوقِهِ يُعْجِبُ الزُّرَّاعَ لِيَغِيظَ بِهِمُ الْكُفَّارَ

وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ مِنْهُم مَّغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا

মুহাম্মদ আল্লাহর রসূল এবং তাঁর সহচরগণ কাফেরদের প্রতি কঠোর, নিজেদের মধ্যে পরস্পর সহানুভূতিশীল।

আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় আপনি তাদেরকে রুকু ও সেজদারত দেখবেন। তাদের মুখমন্ডলে রয়েছে সেজদার চিহ্ন ।

তওরাতে তাদের অবস্থা এরূপ এবং ইঞ্জিলে তাদের অবস্থা যেমন একটি চারা গাছ যা থেকে নির্গত হয় কিশলয়,

অতঃপর তা শক্ত ও মজবুত হয় এবং কান্ডের উপর দাঁড়ায় দৃঢ়ভাবে-চা ষীকে আনন্দে অভিভুত করে-যাতে আল্লাহ তাদের দ্বারা কাফেরদের অন্তর্জালা সৃষ্টি করেন।

তাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা ও মহাপুরস্কারের ওয়াদা দিয়েছেন। [ সুরা ফাতাহ ৪৮:২৯

ইসলামের শিক্ষার যথার্থতা যে, ইসলাম মানুষের আবেগ-অনুভূতির সঠিক ক্ষেত্র নির্দেশ করেছে। কোথায় ব্যবহৃত হবে অনুরাগ-ভালোবাসার শক্তি,

আর কোথায় বিরাগ-বিদ্বেষের শক্তি- কোরআন-সুন্নাহয় তার পরিষ্কার নির্দেশনা আছে।

তোমরা পরস্পর বিদ্বেষ পোষণ করবে না।

حَدَّثَنَا عَبْدُ الْجَبَّارِ بْنُ الْعَلاَءِ الْعَطَّارُ…عَنْ أَنَسٍ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏

لاَ تَقَاطَعُوا وَلاَ تَدَابَرُوا وَلاَ تَبَاغَضُوا وَلاَ تَحَاسَدُوا

وَكُونُوا عِبَادَ اللَّهِ إِخْوَانًا وَلاَ يَحِلُّ لِمُسْلِمٍ أَنْ يَهْجُرَ أَخَاهُ فَوْقَ ثَلاَثٍ

আবদুল জাব্বার ইবনু ’আলা আত্তার … আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

তোমরা পরস্পর সম্পর্ক ছিন্ন করবে না। পরস্পরকে ত্যাগ করবে না, পরস্পর বিদ্বেষ পোষণ করবে না, পরস্পর হিংসা রাখবে না

বরং আল্লাহর বান্দা হয়ে ভাই ভাই হিসাবে থাকবে। কোন মুসলিমের জন্য হালাল নয় তার অপর মুসলিম ভাইকে তিন দিনেরও বেশী পরিত্যাগ করে থাকা।

আজকের মানব-সমাজের অবক্ষয়-অনৈতিকতার এক বড় অংশই কি নয়- মানবের অনুরাগ-বৃত্তির বিপথগামিতার ফল? তেমনি সমাজের হানাহানি, জুলুম-অবিচারেরও এক বড় অংশ কি নয়।

মানবের অসংযত ‘বিদ্বেষের’ কুফল? কাজেই মানবস্বভাবের এই দুই বৃত্তিকে অবশ্যই লাগাম পরাতে হবে। একে স্বেচ্ছাচারিতার পথ থেকে ফেরাতে হবে

এবং সঠিক ও যথার্থ ক্ষেত্রে এর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ইসলাম আমাদেরকে এই শিক্ষা দান করে।

আর এ শিক্ষার প্রকাশ ঘটবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবন সাধনা- দ্বীন ও শরীয়তের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন, সমর্পণ ও ভালোবাসার মাধ্যমে।

কি ভাবে পেতে পারি সুন্দর জীবন।

সুন্নাহ ও শরীয়তের পঠন-পাঠন, অনুসরণ-অনুশীলন, বিস্তার ও সংরক্ষণ ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে মুমিন নিজেকে অগ্রণী ও অগ্রগামী করবে।

আর তা করবে হৃদয়ের গভীরের সেই পবিত্র-ভালবাসা থেকে। কে না বুঝবে যে, দ্বীন ও শরীয়তের অনুসরণের মধ্য দিয়েই আমরা পেতে পারি সুন্দর জীবন ও কল্যাণময় সমাজ?

তাই আসুন, আমরা নবীর প্রতি ভালোবাসা এর মাধ্যমে আমাদের ঈমানকে মজবুত করি, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসি, আল্লাহ তাআলার আনুগত্য ও তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসল্লামের অনুসরণের মাধ্যমে আমাদের জীবনকে আলোকিত করি।

আল্লাহ আমাদের সকলকে সে তাওফীক দান করুক। আমীন।

Facebook Comments

2 Trackbacks / Pingbacks

  1. শ্রেষ্ঠ বান্দা কারা | আমাদের পরিচয় আমরা আল্লাহর বান্দা | Bangla Islam
  2. নবী হাজির নাজির না মনে করে তার উপর দরূদ পাঠ করি | Bangla Islam

Comments are closed.