ওয়াজ ও নসিহত মাইকে কল্যাণকর না অকল্যাণকর? | Bangla Islam

ওয়াজ ও নসিহত
ওয়াজ ও নসিহত মাইকে কল্যাণকর না অকল্যাণকর Bangla Islam

মাইকে ওয়াজ ও নসিহত কল্যাণকর না অকল্যাণকর ?

ওয়াজ ও নসিহতের এ ধারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুরু করে অধ্যবদি উম্মতের মাঝে অব্যাহত রয়েছে মানবজীবনের গুরুত্বপূর্ণ কল্যাণকর একটি অংশ হিসাবে। কিন্তু বর্তমানে মাইকে ওয়াজ ও নসিহত কল্যাণকর না হয়ে অকল্যাণকর হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে তার সঠিক দিকনির্দেশনা ও রীতিনীতি না থাকার কারনে।

যুগ, স্বভাব ও পরিবেশের পরিবর্তনে এতে ব্যবস্থাপনাগত কিছু বৈচিত্র্য এসেছে। তবে বর্তমানের ওলামায়ে কেরাম ও দ্বিনি ভাইয়েরা যদি কিছু বিচ্যুতির সংশোধনের প্রতি খেয়াল করেন,

তাহলে এর উপকারিতা আরো বহু গুণ বৃদ্ধি পাবে। এটি মানবসমাজের উন্নতি ও সংশোধনের অতুলনীয় পন্থা। ইসলামের শুরু থেকেই এর পবিত্র ধারা অদ্যাবধি চলে আসছে।

এমনকি ইসলামপূর্ব যুগেও যুগে যুগে মনীষী ও পণ্ডিতদের পক্ষ থেকে জনসাধারণের প্রতি ওয়াজ-নসিহতের বিষয়টি পাওয়া যায়। কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে:

وَإِذْ قَالَ لُقْمَانُ لِابْنِهِ وَهُوَ يَعِظُهُ يَا بُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ

إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ

যখন লোকমান উপদেশচ্ছলে তার পুত্রকে বললঃ হে বৎস, আল্লাহর সাথে শরীক করো না।

নিশ্চয় আল্লাহর সাথে শরীক করা মহা অন্যায়। সুরা লুকমান ৩১:১৩

ওয়াজ ও নসিহত এর নামে আওয়াজের প্রতিযোগীতা

বর্তমানে মাইক ব্যবহার করে ওয়াজের নামে আওয়াজের যে প্রতিযোগীতা চলছে তা কোন ভাবেই কাম্য নয়। ওয়াজ মাহফিলে মাইক ব্যবহার করা যাবে না তা বলছি না,

বরং বলতে চাচ্ছি মাইক ব্যবহারে সংযত হতে। সংযত ব্যবহার বলতে বুঝায় শ্রোতাদের জন্য যতটুকু আওয়াজের প্রয়োজন ততটুকুর ব্যবহার।

যেমন একটি মাহফিল এ উপস্থিত শ্রোতার সংখ্যা ১০০০ হাজার সেখানে চাইলে শুধুমাত্র চাউন্ড সিস্টেমের মাধ্যমেই ওয়াজ এর আয়োজন করা যায়

অথচ সেখানে ১৫/২০টি মাইক লাগিযে গোটা একটি এলাকায় আওয়াজের ভয়াবহতা সৃষ্টি করা যা ইসলাম ধর্ম কখনো সমর্থন করে না।

কারণ আপনি যখন ওয়াজ করতেছেন ঠিক সেই মুহুর্তে অসংখ্য মানুষ তার ব্যক্তিগত ইবাদত-বন্দেগী, ব্যবসা-বাণিজ্য, লেখাপড়ার কাজে ব্যস্ত,

সেই মুহুর্তে মাইকের উচ্চ আওয়াজের কারণে অন্যের ব্যক্তিগত কাজে সমস্যা হচ্ছে যা হাদিসে সম্পূর্ণ রুপে নিষেধ করা হয়েছে:

حَدَّثَنَا سَعِيدُ بْنُ يَحْيَى بْنِ سَعِيدٍ الْقُرَشِيِّ، قَالَ حَدَّثَنَا أَبِي قَالَ، حَدَّثَنَا أَبُو بُرْدَةَ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي بُرْدَةَ،

عَنْ أَبِي بُرْدَةَ، عَنْ أَبِي مُوسَى ـ رضى الله عنه ـ قَالَ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ أَىُّ الإِسْلاَمِ أَفْضَلُ قَالَ

‏ “‏ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ ‏”‏‏.‏

সা’ঈদ ইবনু ইয়াহ্ইয়া ইবনু সা’ঈদ আল উমাবী আল কুরাশী (রহঃ) … আবূ মূসা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

সাহাবায়ে কিরাম জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! ইসলামে কোন্ কাজটি উত্তম? তিনি বললেনঃ যার জিহ্বা ও হাত থেকে মুসলিমগণ নিরাপদ থাকে।

ওয়াজ ও নসিহত এর জন্য ওয়ায়েজ বা বক্তা নির্বাচন

অবশ্যই সতর্ক হতে হবে যে বক্তা যেন হক্কানি আলেম তথা দ্বিনের সঠিক জ্ঞানসম্পন্ন ও মুত্তাকি হয়ে থাকেন। অযোগ্য ব্যক্তির হাতে ইসলামের কাজ সোপর্দ করা

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামএর বাণী অনুসারে কিয়ামতের নিদর্শন।

حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ سِنَانٍ، حَدَّثَنَا فُلَيْحُ بْنُ سُلَيْمَانَ، حَدَّثَنَا هِلاَلُ بْنُ عَلِيٍّ،

عَنْ عَطَاءِ بْنِ يَسَارٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ

قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏

إِذَا ضُيِّعَتِ الأَمَانَةُ فَانْتَظِرِ السَّاعَةَ ‏”‏‏.‏ قَالَ كَيْفَ إِضَاعَتُهَا يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ

‏”‏ إِذَا أُسْنِدَ الأَمْرُ إِلَى غَيْرِ أَهْلِهِ، فَانْتَظِرِ السَّاعَةَ ‏”‏‏.‏

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন আমানত নষ্ট হয়ে যাবে

তখন কিয়ামতের অপেক্ষা করবে। সে বললঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমানাত কিভাবে নষ্ট হয়ে যাবে? তিনি বললেনঃ

যখন কোন দায়িত্ব অযোগ্য ব্যক্তির উপর ন্যস্ত করা হবে, তখনই কিয়ামতের অপেক্ষা করবে।

 

বর্তমানকার ওয়াজ ও নসিহত এর অর্থ হাসি-মজায় সময় নষ্ট

আজকাল শ্রুতারা সুললিত কণ্ঠের অধিকারী রেডিও-টিভির ভাষ্যকার ইত্যাদি বক্তা খুজে থাকেন যারা অপ্রয়োজনীয় ও বেহুদা হাসি-মজায় সময় নষ্ট করে থাকেন।

হাদিস শরিফে এসেছে:

حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ نَصْرٍ النَّيْسَابُورِيُّ، وَغَيْرُ، وَاحِدٍ، قَالُوا حَدَّثَنَا أَبُو مُسْهِرٍ،

عَنْ إِسْمَاعِيلَ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ سَمَاعَةَ، عَنِ الأَوْزَاعِيِّ، عَنْ قُرَّةَ، عَنِ الزُّهْرِيِّ،

عَنْ أَبِي سَلَمَةَ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم

‏ “‏ مِنْ حُسْنِ إِسْلاَمِ الْمَرْءِ تَرْكُهُ مَا لاَ يَعْنِيهِ ‏”‏

আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

কোন ব্যক্তির ইসলামের অন্যতম সৌন্দর্য হলো অনর্থক আচরণ ত্যাগ করা।

আর এ জন্যই এ ধরণের বক্তারা কখনোই শরিয়াতের মানদণ্ড পতে পারে না। তবে হ্যাঁ, হক্কানি আলেম হওয়ার পাশাপাশি

এসব গুণ কারো মধ্যে থাকলে তাঁদের আমন্ত্রণ জানাতে কোনো অসুবিধা নেই।

ওয়াজ ও নসিহত এর বিষয় ঠিক রেখে জাল হাদিস ও জাল কাহিনিমুক্ত হওয়া

কোরআন, তাফসির, গ্রহণযোগ্য হাদিস এবং পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরামের বাণী এবং সত্য ও শিক্ষণীয় ঘটনাবলির আলোকেই ওয়াজ করা অপরিহার্য।

জাল হাদিস ও অসত্য কাহিনি বর্ণনা করা থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে। যাচাই করা ছাড়া যেকোনো বই থেকে কোনো কথা বা ঘটনা পেয়েই বয়ান শুরু করবে না।

প্রয়োজনে এ ব্যাপারে বিজ্ঞ আলেমদের দিকনির্দেশনা গ্রহণ করবে। জেনেশুনে উপদেশস্বরূপ জাল হাদিস বর্ণনা করা কবিরা গুনাহ।

হাদিস শরিফে এসেছে:

حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ بَشَّارٍ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ مَهْدِيٍّ، حَدَّثَنَا سُفْيَانُ،

عَنْ حَبِيبِ بْنِ أَبِي ثَابِتٍ، عَنْ مَيْمُونِ بْنِ أَبِي شَبِيبٍ، عَنِ الْمُغِيرَةِ بْنِ شُعْبَةَ،

عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ

‏”‏ مَنْ حَدَّثَ عَنِّي حَدِيثًا وَهُوَ يَرَى أَنَّهُ كَذِبٌ فَهُوَ أَحَدُ الْكَاذِبِينَ ‏”‏ ‏

মুগীরাহ ইবনু শুবাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমার পক্ষ হতে

যে লোক কোন হাদীস বর্ণনা করে অথচ সে জানে যে, তা মিথ্যা, সে মিথ্যাবাদীদের একজন।

অন্য হাদিসে এসেছে:

حَدَّثَنَا أَبُو الْوَلِيدِ، قَالَ حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، عَنْ جَامِعِ بْنِ شَدَّادٍ،

عَنْ عَامِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ الزُّبَيْرِ، عَنْ أَبِيهِ،

قَالَ قُلْتُ لِلزُّبَيْرِ إِنِّي لاَ أَسْمَعُكَ تُحَدِّثُ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم

كَمَا يُحَدِّثُ فُلاَنٌ وَفُلاَنٌ‏.‏ قَالَ أَمَا إِنِّي لَمْ أُفَارِقْهُ وَلَكِنْ سَمِعْتُهُ يَقُولُ

‏ “‏ مَنْ كَذَبَ عَلَىَّ فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ ‏”‏‏.‏

আবদুল্লাহ্ ইবনু’য্-যুবায়র (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি আমার পিতা যুবায়রকে বললামঃ আমি তো আপনাকে

অমুক অমুকের মত আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাদীস বর্ণনা করতে শুনি না। তিনি বললেনঃ

‘জেনে রাখ, আমি তাঁর থেকে দূরে থাকিনি, কিন্তু আমি তাঁকে বলতে শুনেছি, যে আমার উপর মিথ্যারোপ করবে

সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নিবে (এজন্য হাদীস বর্ণনা করি না)।

অপব্যয়মুক্ত ওয়াজ ও নসিহত হওয়া

ব্যবস্থাপনা, শৃঙ্খলা, সৌন্দর্যসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচে মধ্যপন্থা কাম্য। অপব্যয় থেকে মুক্ত হওয়া জরুরি। মহান আল্লাহ বলেন,

‘আর তোমাদের অর্থ-সম্পদ অপ্রয়োজনীয় কাজে খরচ করবে না।

إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُواْ إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِرَبِّهِ كَفُورًا

নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। শয়তান স্বীয় পালনকর্তার প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ।

সুরা বনী-ইসরাঈল ১৭:২৭

মাইক ব্যবহারে সতর্কতা

সভাস্থলে এ পরিমাণ মাইক বা সাউন্ড বক্স ব্যবহার করা যেতে পারে যাতে উপস্থিত লোকদের জন্য যতেষ্ট হয়। কারণ দূর-দূরান্তে ও বাজার-ঘাটে অপ্রয়োজনীয় মাইক ব্যবহার উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি।

এতে শরিয়তবিরোধী অনেক কার্যকলাপ পরিলক্ষিত হয়, যেমন—নামাজির নামাজে, ঘুমন্ত ব্যক্তির ঘুমে এবং অসুস্থ ব্যক্তির কষ্ট হয়।

এ কারণে উলামায়ে কেরাম বলে থাকেন মানুষের ঘুমে ব্যাঘাত হয় এমন জোরে কোরআন তেলাওয়াতও জায়েজ নাই। যেমন হাদিসে বর্ণিত রয়েছে:

حَدَّثَنَا يَعْقُوبُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، حَدَّثَنَا هُشَيْمٌ، حَدَّثَنَا أَبُو بِشْرٍ، عَنْ سَعِيدِ بْنِ جُبَيْرٍ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ

ـ رضى الله عنهما ـ فِي قَوْلِهِ تَعَالَى ‏(‏وَلاَ تَجْهَرْ بِصَلاَتِكَ وَلاَ تُخَافِتْ بِهَا‏)

‏ قَالَ نَزَلَتْ وَرَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مُخْتَفٍ بِمَكَّةَ، كَانَ إِذَا صَلَّى بِأَصْحَابِهِ رَفَعَ صَوْتَهُ بِالْقُرْآنِ

فَإِذَا سَمِعَهُ الْمُشْرِكُونَ سَبُّوا الْقُرْآنَ وَمَنْ أَنْزَلَهُ،

وَمَنْ جَاءَ بِهِ، فَقَالَ اللَّهُ تَعَالَى لِنَبِيِّهِ صلى الله عليه وسلم ‏(‏وَلاَ تَجْهَرْ بِصَلاَتِكَ‏)‏

أَىْ بِقِرَاءَتِكَ، فَيَسْمَعَ الْمُشْرِكُونَ، فَيَسُبُّوا الْقُرْآنَ، ‏(‏وَلاَ تُخَافِتْ بِهَا‏)‏

عَنْ أَصْحَابِكَ فَلاَ تُسْمِعُهُمْ ‏(‏وَابْتَغِ بَيْنَ ذَلِكَ سَبِيلاً‏)‏‏.‏

ইয়াকুব ইবনু ইবরাহীম (রহঃ) … ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, সালাতে স্বর উঁচু করবেনা এবং অতিশয় ক্ষীণও করবেনা।

এ আয়াত টি এমন সময় অবতীর্ণ হয় যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় অপ্রকাশ্যে অবস্থান করছিলেন।

তিনি যখন তার সাহাবাদের নিয়ে সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করতেন তখন তিনি উচ্চস্বরে কুরআন পাঠ করতেন।

মুশরিকরা তা শুনে কুরআনকে গালি দিত। আর গালি দিত যিনি তা অবতীর্ণ করেছেন ও যিনি তা নিয়ে এসেছেন।

এজন্য আল্লাহ তা’আলা তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলেছিলেন, “তুমি তোমার সালাতে উচ্চস্বরে কিরাত পড়বে না,

যাতে মুশরিকরা শুনে কুরআনকে গালি দেয়, এবং তা এত নিম্ন স্বরে ও পড়বে না, যাতে তোমার সাহাবীরা শুনতে না পায়, বরং এ দুয়ের মধ্যপথ অবলম্বন কর”।

কেউ অপরের ক্ষতি করবে না

অপর হাদিসে বর্ণিত রয়েছে:

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ

ইবনে আব্বাস (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কেউ অপরের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না

এবং কেউ অপরকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে না। অথবা কেউ অপরের ক্ষতি করবে না এবং অপরের ক্ষতি করার পরিবর্তেও ক্ষতি করবে না।

স্বয়ং কোরআনের ক্ষেত্রেই যদি শব্দ নিয়ন্ত্রণের মাসআলা থাকে তাহলে ওয়াজ ও জিকিরের জন্য থাকবে না কেন? হজরত আবু বকর (রা.) বলতেন,

তাহাজ্জুদে কোরআন তেলাওয়াত খুব নিম্নস্বরে করো। যাতে অন্য কারও ঘুম না ভাঙ্গে। হজরত ওমর (রা.) বলতেন, আমি চাই তেলাওয়াত হালকা উচ্চস্বরে হোক।

যাতে নিদ্রিত ব্যক্তির ঘুম না ভাঙ্গে কিন্তু কিছুটা সজাগ ব্যক্তি পূর্ণ জাগ্রত হয়ে যায়। যেন, তার পক্ষে কিছু নামাজ ও তেলাওয়াত করা সম্ভব হয়। এই ছিল মহান খলিফাদের দৃষ্টিভঙ্গি।

মাইক বা শব্দযন্ত্র আবিষ্কারের আগে মানুষ আজান, নামাজ, ওয়াজ-জিকির ইত্যাদি নিজের কণ্ঠ ব্যবহার করেই করতো। বর্তমানে মাইক ছাড়া এর কোনোটাই চলে না।

মানুষের কষ্ট হয় এমন কোনো আয়োজন ইসলামি শরীয়ত কোনোদিন সমর্থন করেনি, ভবিষ্যতেও করবে না। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

এর সুন্নত ও শরীয়তের জনকল্যাণমূলক নীতি এসব বিষয়ে পরিমিতি সংযম ও শান্তির পক্ষে। একজন হৃদরোগীর কষ্ট বিবেচনা করে,

বর্তমান মাইক বন্ধ রাখা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার দাবি।

কয়েকজন পরীক্ষার্থীর অসুবিধা বিবেচনা করে মাইক বন্ধ রাখা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার মধ্যে পড়ে।

যেখানে কোরআন তেলাওয়াতরত ব্যক্তিকে সালাম না দেওয়া, জরুরি আলোচনায়রত মানুষদের সালাম না দেওয়া, খানা খাওয়া অবস্থায় কাউকে সালাম না দেওয়া,

গভীর চিন্তামগ্ন মানুষকে সালাম না দেওয়া, জিকির বা অজিফা পাঠরত মানুষকে সালাম না দেওয়া, জুমার দিনে নামাজ ও খুতবা চলাকালে মুসল্লিদের সালাম না দেওয়া শরীয়তের বিধান।

সেখানে ব্যক্তিগত হাজারও কাজে নিমগ্ন মানুষের কানের কাছে ১০টি ২০টি মাইক বেঁধে দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওয়াজ শুনতে বাধ্য করা কতটুকু যৌক্তিক তা উদ্যোক্তাদের ভেবে দেখতে হবে।

গভীর রাত না হওয়া

গভীর রাত পর্যন্ত ওয়াজ হলে সাধারণ মানুষের ঘুমে ব্যাঘাত হওয়াসহ পরদিন ফজরের নামাজে ব্যাঘাত হবে, তাই গভীর রাত পর্যন্ত ওয়াজ না হওয়াই কাম্য। এ বিষয়ে হাদিসে এসেছে :

حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ سَلاَمٍ، قَالَ أَخْبَرَنَا عَبْدُ الْوَهَّابِ الثَّقَفِيُّ، قَالَ حَدَّثَنَا خَالِدٌ الْحَذَّاءُ، عَنْ أَبِي الْمِنْهَالِ،

عَنْ أَبِي بَرْزَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم كَانَ يَكْرَهُ النَّوْمَ قَبْلَ الْعِشَاءِ وَالْحَدِيثَ بَعْدَهَا‏.‏

মুহাম্মদ ইবনু সালাম (রহঃ) …. আবূ বারযা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

ইশার পূর্বে নিদ্রা যাওয়া এবং পরে কথাবার্তা বলা অপছন্দ করতেন।

 

বক্তাকে ওয়াজের হাদিয়া দেওয়ার বিধান

সাহাবী ও মুসলিম খলিফাদের যুগে আলেমদের ভরণ-পোষণ ছিল রাষ্ট্রের অধীনে। সে সময় তাঁদের জন্য অন্যের থেকে অর্থ গ্রহণ বৈধ ছিল না।

পরবর্তী যুগের ইসলামী পণ্ডিতরা কিছু কিছু দ্বিনি কাজের বিনিময় দেওয়া-নেওয়া জায়েজ বলেছেন। অনেক আলেম ওয়াজকেও ওই সব কাজের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

কিন্তু ‘এত টাকা দিতে হবে, অন্যথায় ওয়াজ করব না’—এভাবে বলা উচিত নয়।

যেমন পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে:

وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِّمَّن دَعَا إِلَى اللَّهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَقَالَ إِنَّنِي مِنَ الْمُسْلِمِينَ

যে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়, সৎকর্ম করে এবং বলে, আমি একজন আজ্ঞাবহ, তার কথা অপেক্ষা উত্তম কথা আর কার?

সুরা হা-মীম ৪১:৩৩

তবে হ্যাঁ, এ অবস্থায়ও টাকা নেওয়া অবৈধ হবে না। এ বিষয়ে ‘দুররুল মুখতার’ নামক কিতাবে এসেছে : ‘বর্তমানে কোরআন শেখানো,

ওয়াজের টাকার নেওয়ার বৈধতার ফতোয়া

ফিকাহচর্চা, ইমামতি, আজান ইত্যাদির বিনিময় গ্রহণের ব্যাপারে বৈধতার ফতোয়া দেওয়া হয়। কেউ কেউ আজান, ইকামত ও ওয়াজকেও এর অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

পারিশ্রমিক গ্রহণ করার সবচেয়ে বেশি হক রয়েছে আল্লাহর কিতাবের।

যেমন হাদিসে বর্ণিত আছে:

سِيدَانُ بْنُ مُضَارِبٍ أَبُو مُحَمَّدٍ الْبَاهِلِيُّ حَدَّثَنَا أَبُو مَعْشَرٍ الْبَصْرِيُّ

هُوَ صَدُوقٌ يُوسُفُ بْنُ يَزِيدَ الْبَرَّاءُ قَالَ حَدَّثَنِي عُبَيْدُ اللهِ بْنُ الأَخْنَسِ أَبُو مَالِكٍ

عَنْ ابْنِ أَبِي مُلَيْكَةَ عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ نَفَرًا مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم

مَرُّوا بِمَاءٍ فِيهِمْ لَدِيغٌ أَوْ سَلِيمٌ فَعَرَضَ لَهُمْ رَجُلٌ مِنْ أَهْلِ الْمَاءِ فَقَالَ

هَلْ فِيكُمْ مِنْ رَاقٍ إِنَّ فِي الْمَاءِ رَجُلاً لَدِيغًا أَوْ سَلِيمًا فَانْطَلَقَ رَجُلٌ مِنْهُمْ

فَقَرَأَ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ عَلٰى شَاءٍ فَبَرَأَ فَجَاءَ بِالشَّاءِ إِلٰى أَصْحَابِه„ فَكَرِهُوا ذ‘لِكَ

وَقَالُوا أَخَذْتَ عَلٰى كِتَابِ اللهِ أَجْرًا حَتّٰى قَدِمُوا الْمَدِينَةَ

فَقَالُوا يَا رَسُوْلَ اللهِ أَخَذَ عَلٰى كِتَابِ اللهِ أَجْرًا فَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم

إِنَّ أَحَقَّ مَا أَخَذْتُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا كِتَابُ اللهِ.

হাদিসের অর্থ:

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবীগণের একটি দল একটি কূয়ার পার্শ্ববর্তী বাসিন্দাদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন।

কূপের পাশে অবস্থানকারীদের মধ্যে ছিল সাপে কাটা এক ব্যক্তি কিংবা তিনি বলেছেন, দংশিত এক ব্যক্তি।

তখন কূপের কাছে বসবাসকারীদের একজন এসে তাদের বললঃ আপনাদের মধ্যে কি কোন ঝাড়-ফুঁককারী আছেন?

কূপ এলাকায় একজন সাপ বা বিচ্ছু দংশিত লোক আছে। তখন সাহাবীদের মধ্যে একজন সেখানে গেলেন।

এরপর কিছু বক্রী দানের বিনিময়ে তিনি সূরা ফাতিহা পড়লেন। ফলে লোকটির রোগ সেরে গেল। এরপর তিনি ছাগলগুলো নিয়ে তাঁর সাথীদের নিকট আসলেন,

কিন্তু তাঁরা কাজটি পছন্দ করলেন না। তাঁরা বললেনঃ আপনি আল্লাহর কিতাবের উপর পারিশ্রমিক নিয়েছেন।

অবশেষে তাঁরা মাদ্বীনায় পৌঁছে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি আল্লাহর কিতাবের উপর পারিশ্রমিক গ্রহণ করেছেন।

তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ যে সকল জিনিসের উপর তোমরা বিনিময় গ্রহণ করে থাক,

তন্মধ্যে পারিশ্রমিক গ্রহণ করার সবচেয়ে বেশি হক রয়েছে আল্লাহর কিতাবের।

ওয়াজ-নসিহতের মাধ্যমে সমাজের দ্বিনি প্রয়োজন পুরা করাও ইসলামের একটি জরুরি শাখা। তাই যদি কেউ ওয়াজের জন্য নিজেকে ফারেগ রাখে,

তার জন্য ওয়াজের পারিশ্রমিক গ্রহণ বৈধ হবে, চাই চুক্তি করে হোক বা পূর্বচুক্তিবিহীন। তবে উত্তম হলো, এভাবে চুক্তি করে টাকা ধার্য না করা।

(রদ্দুল মুহতার : ৬/৫৫, ইমদাদুল ফাতাওয়া : ৩/৩৮৯)

 

মানুষকে কষ্ট দেওয়া হারাম।

যেমন কোরআনে বর্ণিত আছে:

وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُّبِينًا

যারা বিনা অপরাধে মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে কষ্ট দেয়, তারা মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে।

সুরা আহযাব ৩৩:৫৮

শরীয়ত যে নির্দেশ চাপিয়ে দেয়নি, নিজ সিদ্ধান্তে এমন কঠোর পরিবেশ তৈরি করা শরীয়তে পরিষ্কার নিষিদ্ধ। যে জন্য হজরত ওমর (রা.)

একবার এক ব্যক্তিকে এজন্য শাস্তি দিয়েছিলেন যে, লোকটি নামাজের পর মসজিদে দাঁড়িয়ে বলেছিল, ‘কিছু খেজুর পাওয়া গেছে, যার হয় নিয়ে যাবেন। ’

সাজা দেওয়ার সময় বলেছিলেন, মদিনায় কি এখন দুর্ভিক্ষ চলছে যে, কয়েকটি খেজুরের জন্য গোটা মসজিদের মুসল্লিদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে হবে?

এটি কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো? এমন ফালতু একটি কাজের জন্য সব মুসল্লিকে বিরক্ত করায় তোমাকে এই শাস্তি দিলাম।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে ওয়াজের গুরুত্ব বুঝে এবং শরিয়াত অনুযায়ী বাস্তবায়ন করে ছোয়াবের অংশীদার হওয়ার তাওফিক দান করুক। আমিন।

মাও. ইবরাহিম মোস্তফা
মাও. ইবরাহিম মোস্তফা
Facebook Comments

1 Trackback / Pingback

  1. ওয়াজ করার সঠিক তরীকা | পার্ট ০১ | Bangla Islam - বাংলা ইসলাম

Comments are closed.