উমর বিন আব্দুল আজিজ কেমন ছিল | ইসলামে ৫ম খলিফা কেন | বাংলা ইসলাম

উমর বিন আব্দুল আজিজ
উমর বিন আব্দুল আজিজ কেমন ছিল ইসলামে ৫ম খলিফা কেন বাংলা ইসলাম

কেমন ছিল উমর বিন আব্দুল আজিজ

সাহাবীদের পর ইসলামের মর্দে মুজাদ্দিদ হলেন হজরত উমর বিন আব্দুল আজিজ রহমাতুল্লাহি আলাইহি। তাঁর মাতা ছিলেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শশুর ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর নাতনী।

যিনি প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওফাতের ৫০ বছর পর ২ নভেম্বর ৬৮২ ঈ, ২৬ সফর ৬৩ হিজরিতে জন্ম গ্রহণ করেন।

তাঁর রাজত্বের সময়কালে অসংখ্য সাহাবা ও তাবেঈ জীবিত ছিল।

খুলাফায়ে রাশেদিন এর চার খলিফার সাথে তুলনা করতে গিয়ে অনেকে তাকে ইসলামের পঞ্চম খলিফা বলে থাকেন।

তিনি ইসলামের ইতিহাসে দ্বিতীয় উমর নামে পরিচিত ছিলেন।

উমর ইবনে আবদুল আজিজ উমাইয়া বংশীয় একজন শাসক। উমাইয়া বংশীয় অন্যান্য শাসকদের মতো তাকেও মুসলিম জাহানের খলিফা হিসেবে গণ্য করা হয়।

বিশ্বের ইতিহাসে সফল শাসকদের অন্যতম ছিলেন খলীফা ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ। শাসনকাল ৯৯ হতে ১০১ হিজরি। তিনি উমাইয়া শাসকদের একজন।

মাত্র ২ বছরে মুসলিম বিশ্বে নবুওয়তী ধারার খেলাফতি রাষ্ট্র ব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত করেন। মুসলিম জাহানে শান্তি ও সমৃদ্ধির উৎকর্ষ সধিত হয়।

উমর বিন আব্দুল আজিজ তাঁর পিতা তাঁকে কোন কাজে নিযুক্ত করেছিলেন

হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র) যখন তাঁর পিতা আবদুল আজীজের নিকট থাকতেন তখন তাঁর পিতাকে তাঁকে কোন কাজে নিযুক্ত করেছিলেন কিনা,

তাঁকে প্রশাসণিক কোন দায়িত্ব দিয়েছিলেন কিনা তা জানা সক্ষম হয়নি।

মনে হয়, তিনি সামান্য কিছুদিন পিতার সাথে অবস্থান করেছিলেন। যখন তিনি পিতার নিকট আসলেন তখন তাঁর পিতা ও চাচা আবদুল মালেকের মধ্যে যুবরজ নিযুক্তির ব্যাপারে মন-কষাকষি চলছিল।

আবদুল মালেকের ইচ্ছা ছিল যে, আবদুল আজীজ-এর পুত্র ওমর ওয়ালিদের স্বপক্ষে খেলাফতের দাবী পরিত্যাগ করুক।

কিন্তু আবদুল আজীজ এতে সম্মত ছিলেন না।

ইবনে আবদুল হাকাম বলেন, তাঁর চাল-চলনে আমীরানা এবং আড়ম্বরপূর্ণ ভাব ছিল। কিন্তু সাথে সাথে এ কথাও স্বীকার করেছেন যে,

এ আড়ম্বরপূর্ণ ভোগ-বিলাস সত্ত্বেও তিনি কখনও হারাম মাল ভক্ষণ করতেন না,

পরস্ত্রীর প্রতি কোনদিন ফিরে চাননি এবং কখনও শরীয়ত বিরোধী কোন আদেশ জারী করতেন না। তিনি যখন মদীনায় এসে শাসনভার গ্রহণ করলেন,

তখন মদীনার দশজনদ বিশিষ্ট ফকীহ ও আলেমকে একত্রিত করে তাদের নিকট সকল ধরণের পরামর্শ চাইতেন এবং সে অনুযায়ী কাজ করতেন।

এবং বলতেন যদি আপনারা আমার কোন কর্মচারীকে জুলুম করতে দেখেন অথবা কারো প্রতি জুলুমের সংবাদ পান

তবে আপনাদের উপর দায়িত্ব হল যে, সে ব্যাপারে আমাকে জানাবেন।

ওমর ইবনে আবদুল আজিজ মদীনার শাসনকর্তা হিসেবে যেরূপ ন্যায়পরায়ণতা, সুবিচার ও নিষ্ঠা সাথে শাসনকার্য পরিচালনা করেছিলেন,

সম্রাজ্যবাদ বিদ্বেষী ফকীহ সাঈদ ইবনে মুযায়্যাব রহ. উমর বিন আব্দুল আজিজ এর ব্যপারে কি বলেছিলেন?

যার ফলেই মদীনার সবচেয়ে বেশি আত্মমর্যাদাশীল ও সম্রাজ্যবাদ বিদ্বেষী ফকীহ সাঈদ ইবনে মুযায়্যাব (র) তাঁকে মাহদী উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।

ইবনে সাদ বলেন- একদা কোন এক ব্যক্তি ইবনে মুসায়্যাব রহ. কে জিজ্ঞেস করল যে, মাহদীর গুণাবলী কি কি?

তিনি বললেন, মারওয়ানের বাসভবনে গিয়ে নিজের চোখে মাহদীকে দেখে আস।

পূর্বেকার শাসকদের লুটপাট, বিলাসিতা ও জনগণের সম্পদগ্রাস তিনি পছন্দ করতেন না।

ক্ষমতায় বসেই তাদের সব অবৈধ সম্পদ রাষ্ট্রের অনুক‚লে বাজেয়াপ্ত করেন।

দুর্নীতি, অপচয়, শোষণ সর্বাংশে বন্ধ করেন। তখন শাসক ও অভিজাত শ্রেণি লোক তার দুশমন হয়ে দাঁড়ায়।

বাইয়াত তথা আনুগত্য গ্রহণ করার সময় তিনি জনসমাবেশে সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন যে, ‘আমি তোমাদেরকে আমার বাইয়াত থেকে মুক্ত করে দিচ্ছি।

তোমরা নিজেদের ইচ্ছা মতো কাউকে খলিফা নির্বাচন করে নিতে পার। অতঃপর জনগণ সর্বসম্মতভাবে এবং সাগ্রহে বলল যে,

‘আমরা আপনাকেই নির্বাচন করছি; তখনই তিনি স্বহস্তে খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

ইবনে কাছীর বলেন- আবদুল আজীজ ধন-সম্পদ, উট-ঘোড়া, গাধা-খচ্চর ইত্যাদি অগণিত সম্পদ রেখে গিয়েছিলেন।

তাঁর পরিত্যক্ত সম্পত্তির মধ্যে শুধু স্বর্ণই ছিল তিন শত মুদ

অর্থাৎ আমারেদ দেশী হিসেবে ৭৫০ মণ (সাতশত পঞ্চাশ মণ)।

পরে হজরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ রহমাতুল্লাহি আলাইহি যখন খলিফা নিযুক্ত হন তখন তার সব বাইতুল মালে জমা করে দেন।

তিনি এমন ভাবে খেলাফত প্রতিষ্ঠা করেন যে বলা হয়ে থাকে আটলান্টিক থেকে আফগানিস্তান পর্যন্ত এমন কোনো দরিদ্র নাগরিক খুঁজে পাওয়া যেত না যাকে যাকাত দেওয়া যায়।

এ জন্য তিনি লোকদের থেকে যাকাত নিয়ে সেই তহবিল দিয়ে ক্রীতদাস কিনে আজাদ করে দিতেন।

নাগরিকদের সুখ শান্তির প্রতি খেয়াল থেকে তিনি ব্যক্তিগত নিরাপত্তার চিন্তা করতেন না বললেই চলে।

আমার পাহারায় মৃত্যুকেই নিয়োজিত করেছি

নিজের নিরাপত্তার জন্য উপদেষ্টারা জোর দিলে বলতেন, ‘আমার পাহারায় মৃত্যুকেই নিয়োজিত করেছি। তার নির্ধারিত সময়ের আগে আর কেউ আমাকে মারতে পারবে না।

আর যখন নির্ধারিত সময়ে মৃত্যু আসবে, তখন সারা সৃষ্টিজগত মিলেও আমাকে বাঁচাতে পারবে না।

এ সুযুগে নিজ গোষ্ঠীর লোকেরা তার প্রাণহানীর চেষ্টা শুরু করে। অবশেষে তাকে বিষ প্রয়োগ করে।

বলা হয়ে থাকে তার পানাহার দায়িত্বে নিয়োজিত খাদেমকে তার বংশের লোকেরাই খাদ্যে বিষ মেশানোর কাজে ব্যবহার করে। সে রাজী না হলে এক হাজার দিনার প্রদান করে।

এতেও রাজী না হলে প্রাণ নাশের হুমকি দেয়। শেষ পর্যন্ত খাদেম পানির সাথে বিষ মিশিয়ে দেয়। পানি পানের পর ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ বিষক্রিয়া টের পান।

অবশ্য বিষজনিত কারণে তিনি মারা গিয়েছিলেন, একথা প্রমাণিত নয়। তার স্ত্রী বাদশা আব্দুল মালিকের মেয়ে ফাতিমা বলেন,

আল্লাহতায়ালার সীমাহীন ভয় এবং জাতির কল্যাণে তার কল্পনাতীত কষ্ট সাধনা ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের মৃত্যুর কারণ।

কবে তিনি এ দুনয়ার মায়া ত্যাগ করেন?

বিষ প্রয়োগে তার ক্ষতি হয়েছিল বটে, তবে এর প্রতিক্রিয়ায় তিনি মারা যাননি। তিনি সুস্থ হয়ে উঠেন এবং পরে সাধারণ স্বাস্থ্যহানীতে বিশেষ করে:

আল্লাহর ভয়ে অধিক সাধনা ও জনকল্যাণে অকল্পনীয় পরিশ্রমে ৩১ জানুয়ারি ৭২০ ঈ, ১৬ রজব ১০১ হিজরিতে এ দুনয়ার মায়া ত্যাগ করে আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যান।

ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ যখন বুঝতে পারলেন তাকে বিষ দেওয়া হয়েছে তখন তিনি পানাহারের দায়িত্বে থাকা খাদেমকে ডেকে বললেন, কেন তুমি আমাকে বিষ দিলে?

সে বলল, এক হাজার দিনার ও মুক্ত হওয়ার লোভে। খলীফা বললেন, দিনারগুলো নিয়ে আসো। এসব তিনি জনগণের তহবিলে রেখে দিলেন।

বললেন, যারা এসব দিয়েছে, তারা নিজেদের টাকা দেয়নি।

জনগণ থেকে চুরি করা টাকা থেকেই আমাকে হত্যার জন্য দিয়েছে। আর তুমি এখন মুক্ত।

রাষ্ট্রের কোনো দায়িত্বশীলের সামনে কখনো পড়বে না। সাম্রাজ্যের যে কোনো অঞ্চলে জীবন কাটিয়ে দাও।

উপদেষ্টারা বললেন, তাকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হোক। খলীফা জবাব দিলেন, সে তো আমাকে হত্যা করেনি। চেষ্টা করেছে মাত্র। আমার মৃত্যু হলে সে অপরাধী হয়ে যাবে।

তাই তাকে ক্ষমা করে দিচ্ছি। এর বিনিময় আমি আল্লাহর কাছে পাব। আখেরাতে এই বিনিময় হবে অনেক দামী।

পাশাপাশি আমি এ যড়যন্ত্রের সঙ্গে বাকি সবাইকেও ক্ষমা করে দিলাম।

সব বিনিময় আমি পরকালেই পেতে চাই। এর কিছুদিন পর খলীফা ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ ইন্তেকাল করেন।

ক্ষমতায় আরোহন করে তিনি সর্ব প্রথম যে কাজ গুলো করেন।

রাজ পরিবারের সংশোধন করে অত্যাচারী গভর্ণরদেরকে বরখাস্ত করেন।
সৎলোকদেরকে অনুসন্ধান করে গভর্ণরের দায়িত্ব দেন।
জাকাত আদায়ের যে ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল, তা নতুনভাবে সংশোধণ করেন।
বায়তুল মালের অর্থকে সাধারণ মুসলমানের কল্যাণের জন্য ওয়াক্ফ করে দেন।
অমুসলিমদের যে উপাসনালয় অন্যায়ভাবে দখল করা হয়েছিল, সেগুলো তাদেরকে ফিরিয়ে দেন।
কাফেরদের যে সব জমি ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিল, তাও তিনি তাদেরকে ফেরত দেন।
রাষ্ট্রের বিচার বিভাগকে সরকারের শাসন বিভাগের অধীনতা থেকে মুক্ত করেন।

আর এভাবেই হজরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ রাষ্ট্র ব্যবস্থা সুন্দর, সুসজ্জিত ও সসংহত করতে ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও পুনরুজ্জীবিত করেন।

তাঁর অল্প দিনের শাসন ব্যবস্থা অর্ধ শতাব্দীর জাহেলি রীতি-নীতি অপসারিত হয়। বন্ধ হয়ে যায় বিকৃত আকিদা-বিশ্বাসের প্রচার ও প্রসার। ব্যাপকভাবে জনগণের শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়।

কুরআন হাদিস ও ইলমে ফিকহার শিক্ষা ব্যবস্থা বুদ্ধিজীবী শ্রেণীকে আকৃষ্ট করে।

যার ফলে হজরত ইমাম আবু হানিফা, মালিক, শাফেয়ী ও আহমাদ ইবনে হাম্বল রাহমাতুল্লাহি আলাইহির মতো জগৎ বিখ্যাত বিদ্যান ব্যক্তিদের আবির্ভাব হয়।

হজরত উমর বিন আব্দুল আজিজ রহ. এর ক্ষমতাকালে অবস্থা এতটাই উন্নত হয় যে, ৪ জন লোক একত্রিত হলেই

সেখানে নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত ও কুরআন-সুন্নাহ সম্পর্কিত আলোচনা শুরু হয়ে যেত।

হজরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের মৃত্যুর পর রোমান সম্রাটের মন্তব্য থেকেই তা অনুমিত হয়। রোমান সম্রাট বলেছিল

‘কোনো সংসার বৈরাগী যদি সংসার ত্যাগ করে নিজের দরজা বন্ধ করে নেয় এবং ইবাদতে মশগুল হয়; তাহলে আমি তাতে মোটেই অবাক হই না।

কিন্তু আমি অবাক হই সে লোকের ব্যাপারে, যার পদতলে ছিল দুনিয়ার বিপুল ধন-সম্পদ; আর সে তা হেলায় ঠেলে ফেলে দিয়ে ফকিরের ন্যায় জীবন-যাপন করে।

Facebook Comments

1 Trackback / Pingback

  1. সুদের শাস্তি কি | জাহান্নামের শাস্তি কেমন হবে | Bangla Islam

Comments are closed.