ইসলামে খাদ্যপণ্য মজুদ | কোরআন হাদিস কি বলে ? | Bangla Islam

ইসলামে খাদ্যপণ্য মজুদ
ইসলামে খাদ্যপণ্য মজুদ কোরআন হাদিস কি বলে Bangla Islam

ইসলামে খাদ্যপণ্য মজুদ | কোরআন হাদিস কি বলে ?

বিশ্বব্যপী গুদামজাত করণ যে ব্যবসা মানুষ করছে এ ব্যপারে ইসলামে খাদ্যপণ্য মজুদ, কোরআন হাদিস কি বলে ? এ শিরনামে আজ আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব ইনশা-আল্লাহ।

নিত্যপ্রয়োজনিয় পণ্য গুদামজাত করে, দাম বাড়িয়ে যে মুনাফা বর্তমানকার ব্যবসায়ীরা করে, তা কতটুকু পরিশুদ্ধ উপার্জন?। আর কারও উপার্জন যদি পবিত্র, পরিশুদ্ধ ও হালাল না হয়, তবে তার দোয়া কবুল হয়?।

গুদামজাত করণ ব্যপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদিসে বলেছেন:

حَدَّثَنَا نَصْرُ بْنُ عَلِيٍّ الْجَهْضَمِيُّ… عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم 

الْجَالِبُ مَرْزُوقٌ وَالْمُحْتَكِرُ مَلْعُونٌ‏.‏

উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

আমদানী পণ্য সরবরাহকারী ব্যবসায়ী রিযিক প্রাপ্ত হয় এবং মজুতদাতা অভিশপ্ত।

حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ…عَنْ مَعْمَرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ نَضْلَةَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم

لاَ يَحْتَكِرُ إِلاَّ خَاطِئٌ ‏ ‏.‏

মা‘মার ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে নাদলা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

পাপিষ্ঠ ব্যক্তি ছাড়া কেউ মজুতদারি করে না।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা ক্রয়-বিক্রয় সম্পর্কে ইরশাদ ফরমান:

اَلَّذِیۡنَ یَاۡکُلُوۡنَ الرِّبٰوا لَا یَقُوۡمُوۡنَ اِلَّا کَمَا یَقُوۡمُ الَّذِیۡ یَتَخَبَّطُہُ الشَّیۡطٰنُ مِنَ الۡمَسِّ

ذٰلِکَ بِاَنَّہُمۡ قَالُوۡۤا اِنَّمَا الۡبَیۡعُ مِثۡلُ الرِّبٰوا

وَ اَحَلَّ اللّٰہُ الۡبَیۡعَ وَ حَرَّمَ الرِّبٰوا ؕ

فَمَنۡ جَآءَہٗ مَوۡعِظَۃٌ مِّنۡ رَّبِّہٖ فَانۡتَہٰی فَلَہٗ مَا سَلَفَ ؕ وَ اَمۡرُہٗۤ اِلَی اللّٰہِ ؕ

وَ مَنۡ عَادَ فَاُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ النَّارِ ۚ ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ

যারা সুদ খায়, তারা তার ন্যায় (কবর থেকে) উঠবে, যাকে শয়তান স্পর্শ করে পাগল বানিয়ে দেয়।

এটা এ জন্য যে, তারা বলে, বেচা-কেনা সুদের মতই।

অথচ আল্লাহ বেচা-কেনা হালাল করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন।

অতএব, যার কাছে তার রবের পক্ষ থেকে উপদেশ আসার পর সে বিরত হল, যা গত হয়েছে তা তার জন্যই ইচ্ছাধীন।

আর তার ব্যাপারটি আল্লাহর হাওলায়। আর যারা ফিরে গেল, তারা আগুনের অধিবাসী। তারা সেখানে স্থায়ী হবে।

ইসলামে খাদ্যপণ্য মজুদ নিয়ে রাসুলের হাদিস

যে ব্যক্তি কোনো খাদ্যপণ্য ৪০ দিনের বেশি মজুদ করে রাখবে সে ওই খাদ্যপণ্য সাদকা করে দিলেও তার গুদামজাত করার গুনাহ মাফ হবে না। যেমন হাদিসে বর্ণিত রয়েছে:

وَعَنْ أَبِىْ اُمَامَةَ : أَنَّ رَسُوْلَ اللّٰهِ ﷺ قَالَ :

مَنِ احْتَكَرَ طَعَامًا أَرْبَعِينَ يَوْمًا ثُمَّ تَصَدَّقَ بِه لَمْ يَكُنْ لَه كَفَّارَةً

আবূ উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

যে ব্যক্তি চল্লিশ দিন পর্যন্ত খাদ্যজাত দ্রব্য গুদামজাত করে রাখবে, সে তার এ মাল দান-খয়রাত করে দিলেও তার জন্য যথেষ্ট (কাফফারা) হবে না।

একটি হাদিসে আছে : হযরত আনাস (রা.) বলেছেন, আমি একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে আরজ করলাম,

হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর দরবারে দোয়া করুন যেন আমার দোয়া কবুল হয়।

রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আনাস, তোমার উপার্জনকে পবিত্র ও হালাল রাখ। তবে তোমার দোয়া কবুল হবে।

কেননা, কেউ হারাম খাদ্যের এক লোকমা মুখে দিলেও ৪০ দিন পর্যন্ত দোয়া কবুল হয় না।

অন্য এক হাদিসে আছে : হযরত আবু বকর (রা.) বলেছেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি,

যে শরীর হারাম খাদ্য দিয়ে পরিপূর্ণ হয়, জাহান্নামই তার শ্রেষ্ঠ স্থান।

আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ হতেই দ্রব্যমূল্যের উত্থান-পতন।

: وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ : غَلَا السِّعْرُ عَلٰى عَهْدِ النَّبِىِّ ﷺ

فَقَالُوْا : يَا رَسُوْلَ اللّٰهِ! سَعِّرْ لَنَا فَقَالَ النَّبِىُّ ﷺ

إِنَّ اللّٰهَ هُوَ الْمُسَعِّرُ الْقَابِضُ الْبَاسِطُ الرَّازِقُ

وَإِنِّىْ لَأَرْجُوْ أَنْ أَلْقٰى رَبِّىْ وَلَيْسَ أَحَدٌ مِنْكُمْ يَطْلُبُنِىْ بِمَظْلِمَةٍ بِدَمٍ وَلَا مَالٍ

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আমলে এক সময় দ্রব্য-সামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি পেল।

লোকেরা অনুরোধ করল- হে আল্লাহর রসূল! দ্রব্য-সামগ্রীর মূল্য সুনির্ধারিত করে দিন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ

দ্রব্যমূল্যের উত্থান-পতন আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ হতেই নির্ধারিত হয়ে থাকে। সুতরাং সঙ্কীর্ণতা ও প্রশস্ততা একমাত্র তিনিই আনেন এবং তিনিই রিযক দিয়ে থাকেন।

সদাসর্বদা আমার এ প্রচেষ্টাই থাকবে, আমি আল্লাহর কাছে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করি যেন আমার ওপর তোমাদের কারো জানের বা মালের প্রতি কোনো অন্যায়-অবিচারের দাবি না থাকে।

পণ্য মজুদকারী ভালো লোক হতেই পারে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে অত্যন্ত খারাপ লোক বলে উল্লেখ করেছেন। বলেছেন ;

পণ্য মজুদকারী ব্যক্তি অত্যন্ত খারাপ লোক হয়ে থাকে।

তার একটি স্বভাব বা প্রবণতার কথা বলেছেন এভাবে : সে যদি শুনতে পায় পণ্যমূল্য কমে গেছে, তাহলে তার খুব খারাপ লাগে, আর যদি শোনে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে উল্লসিত হয়ে উঠে।

পেশা হিসেবে ব্যবসা অতুলনীয়। মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদন বা আমদানি করে তাদের কাছে পৌঁছে দেয়ার মতো মানবিক কল্যাণমূলক কাজ আর হতে পারে না।

কোন ব্যবসায়ী কেয়ামতের দিন শহীদদের সঙ্গে অবস্থান করবে?

এর মধ্যে তার রিজিকের সংস্থানও রয়েছে। ব্যবসায়ীকে তাই বিশ্বস্ত ও সৎ হতে হয়। আল্লাহর রাসূল সা. বলেছেন : বিশ্বস্ত ও সত্যাশ্রায়ী ব্যবসায়ী কেয়ামতের দিন শহীদদের সঙ্গে অবস্থান করবে।

একটি হাদিসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : কেয়ামতের দিন আল্লাহতায়ালা তিনজনের প্রতি তাকাবেন না। তাদের মধ্যে একজন হচ্ছে মিথ্যা কসম করে যে লোক তার পণ্য বিক্রি করে।

ব্যবসায়ীদের এসব চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য থাকা অপরিহার্য। এ ছাড়াও তাদের আরও কিছু শর্ত মেনে চলতে হয়।

পণ্য মজুদ না করা, উদ্দেশ্যমূলকভাবে পণ্যের দাম না বাড়ানো, অধিক মুনাফা না করা, ওজনে কম না দেয়া ইত্যাদি।

পাশাপাশি তাকে ইসলামের হালাল-হারাম বিধি মেনে চলতে হয়। মিথ্যা কসম, ধোঁকাবাজি, কেনার সময় বেশি নেয়া ও বেচার সময় কম দেয়া- এসব নিষিদ্ধ।

عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ قَالَ : سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللّٰهِ ﷺ يَقُولُ :

مَنِ احْتَكَرَ عَلَى الْمُسْلِمِينَ طَعَامَهُمْ ضَرَبَهُ اللّٰهُ بِالْجُذَامِ وَالْإِفْلَاسِ

উমার ইবনুল খত্ত্বাব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি,

যে ব্যক্তি মুসলিমের ওপর অভাব-অনটন সৃষ্টি করে খাদ্য-সামগ্রী গুদামজাত করবে, আল্লাহ তা‘আলা তাকে কুষ্ঠরোগে এবং দারিদ্রে নিপতিত করবেন।

কসম দিয়ে পণ্য বিক্রি করলে কি হয়?

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : কসম দিয়ে পণ্য বিক্রি করলে বরকত হয় না। পণ্য বিক্রির সময় পণ্যে কোনো দোষ-ত্রুটি থাকলে ক্রেতার কাছে তা প্রকাশ করা উচিত।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : দোষত্রুটি না বলে পণ্য বিক্রি করা হালাল নয়। একবার তিনি বাজারে গিয়ে দেখলেন, এক ব্যক্তি শস্য বিক্রি করছে। তা তার খুব পছন্দ হলো।

পরে তিনি স্ত‚পের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে দিলেন। দেখলেন, হাত ভিজে গেল। তখন তিনি বিক্রেতাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে শস্য ব্যবসায়ী, এসব কি? সে বলল, বৃষ্টির পানিতে ভিজে গেছে।

তখন নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : তাহলে তুমি এ ভিজে শস্যগুলো ওপরে রাখলে না কেন, তাহলে ক্রেতারা দেখতে পেত? এ তো ধোঁকা।

আর যে আমাদের সঙ্গে ধোঁকাবাজি করবে সে আমাদের দলভুক্ত নয়।

পণ্য বিক্রির সময় সঠিকভাবে মেপে দেয়ার জন্য কঠোর তাগিদ দিয়েছেন আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। সঠিক দাঁড়িপাল্লা দিয়ে মাপার কথাও তিনি বলেছেন। বলেছেন :

এ নীতি অত্যন্ত কল্যাণকর এবং পরিণতির দিক দিয়ে খুবই ভালো ও উত্তম। তার এ নির্দেশনার ব্যত্যয় ঘটলে পরিণতি হবে ভয়াবহ। তার ভাষায় : মাপে-ওজনে যারা কম করে, তাদের জন্য বড়ই দুঃখ।

তারা যখন লোকদের কাছ থেকে কিছু মেপে নেয় তখন পুরোপুরি গ্রহণ করে। আর যখন তারা মেপে বা ওজন করে দেয়, তখন কম করে দেয়।

তারা-কি ভেবে দেখে না যে, তারা সেই কঠিন দিনে পুনরুত্থিত হবে, যেদিন সমস্ত মানুষ রাব্বুল আলামীনের সামনে দাঁড়িয়ে যাবে।

ইসলামে খাদ্যপণ্য মজুদ নিয়ে আমরা যে আলোচনা করলাম তা থেকে পূর্ণ উপকার নেওয়ার তাওফিক আল্লাহ আমাদের সকলকে দান করুক। আমিন।

Facebook Comments