আরশ বেষ্টনকারী কারা | দুনিয়া সৃষ্টির আগে কি ছিল? | বাংলা ইসলাম

আরশ বেষ্টনকারী কারা
আরশ বেষ্টনকারী কারা দুনিয়া সৃষ্টির আগে কি ছিল বাংলা ইসলাম

আল্লাহর আরশ বেষ্টনকারী কারা?

আরবি ভাষাভাষিরাদের নিকট আরশ শব্দটির শাব্দিক অর্থ উচু ছাদ বিশিষ্ট কিছু। কিন্তু আল্লাহর আরশ কি এবং আল্লাহর আরশ বেষ্টনকারী কারা এ নিয়ে আমরা আজ কিছু আলচনা করব। ইনশা-আল্লাহ।

আরবিতে ছাদ বিশিষ্ট উটের হাওদাকেও আরশ বলে। যা ব্যবহার হয় মরুভূমীতে চলার সময় রদ্র বৃষ্টি ইত্যাদি থেকে বাচার জন্য উটের উপর এক ধরণের ছাদ তৈরী করা হয় তাকেই আরবিতে আরশ বলা হয়।

এ ছাড়াও আরবি ভাষায় রাজার সিংহাসনকে বুঝাতেও আরশ শব্দটির ব্যবহার হয়। যেমন কোরআনে ইরশাদ হয়েছে:

قَالَ يَا أَيُّهَا المَلَأُ أَيُّكُمْ يَأْتِينِي بِعَرْشِهَا قَبْلَ أَن يَأْتُونِي مُسْلِمِينَ

সুলায়মান বললেন, হে পরিষদবর্গ, তারা আত্নসমর্পণ করে আমার কাছে আসার পূর্বে কে বিলকীসের সিংহাসন আমাকে এনে দেবে?  সুরা নাম’ল আয়াত : ৩৮

فَلَمَّا جَاءتْ قِيلَ أَهَكَذَا عَرْشُكِ قَالَتْ كَأَنَّهُ هُوَ وَأُوتِينَا الْعِلْمَ مِن قَبْلِهَا وَكُنَّا مُسْلِمِينَ

অতঃপর যখন বিলকীস এসে গেল, তখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হল, তোমার সিংহাসন কি এরূপই? সে বলল, মনে হয় এটা সেটাই। আমরা পূর্বেই সমস্ত অবগত হয়েছি এবং আমরা আজ্ঞাবহও হয়ে গেছি। সুরা নাম’ল আয়াত : ৪২

এখানে আল্লাহর আরশ কি এ ব্যপারে ইমাম রাযী (রহ.) বলেন : আল্লাহপাকের অসীম তার কিছুটা ধারণা দেওয়ার জন্য ‘আল্ আরশুল আজীম’ এই রূপক শব্দটি ব্যবহৃত হয়।

আরশ শব্দটি আল কোরআনে সর্বমোট ২২ বার ব্যবহৃত হয়েছে। ‘আরশুহু’ রূপে সূরা হুদ-এর ৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন: তাঁর আরশ ছিল পানির উপরে।

وَهُوَ الَّذِي خَلَق السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ وَكَانَ عَرْشُهُ عَلَى الْمَاء لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلاً

وَلَئِن قُلْتَ إِنَّكُم مَّبْعُوثُونَ مِن بَعْدِ الْمَوْتِ لَيَقُولَنَّ الَّذِينَ كَفَرُواْ إِنْ هَـذَا إِلاَّ سِحْرٌ مُّبِينٌ

তিনিই আসমান ও যমীন ছয় দিনে তৈরী করেছেন, তাঁর আরশ ছিল পানির উপরে, তিনি তোমাদেরকে পরীক্ষা করতে চান যে, তোমাদের মধ্যে কে সবচেয়ে ভাল কাজ করে।

আর যদি আপনি তাদেরকে বলেন যে, “নিশ্চয় তোমাদেরকে মৃত্যুর পরে জীবিত ওঠানো হবে, তখন কাফেরেরা অবশ্য বলে এটা তো স্পষ্ট যাদু! সুরা হুদ আয়াত : ৭

আল্লাহর আরশ বেষ্টনকারী কারা কোরআনে ইরশাদ হয়েছে

এতদপ্রসঙ্গে আল-কোরআনে ইরশাদ হয়েছে : ‘আর তুমি ফিরিশতাদেরকে দেখতে পাবে যে, তারা আরশের চতুস্পার্শ্ব ঘিরে তাদের প্রতিপালকের প্রশংসা, পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছে।

وَتَرَى الْمَلَائِكَةَ حَافِّينَ مِنْ حَوْلِ الْعَرْشِ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَقُضِيَ بَيْنَهُم بِالْحَقِّ

وَقِيلَ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ

আপনি ফেরেশতাগণকে দেখবেন, তারা আরশের চার পাশ ঘিরে তাদের পালনকর্তার পবিত্রতা ঘোষনা করছে। তাদের সবার মাঝে ন্যায় বিচার করা হবে।

বলা হবে, সমস্ত প্রশংসা বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহর। সুরা যুমার আয়াত : ৭৫

অপর এক আয়াতে ইরশাদ হয়েছে : ‘সেদিন মহা প্রলয় সঙ্ঘঠিত হবে এবং আকাশ বিদীর্ণ হয়ে বিশ্লিষ্ট হয়ে পড়বে। ফিরিশতাগণ আকাশের প্রান্তদেশে থাকবে

এবং সেদিন আটজন ফিরিশতা তাদের প্রতিপালকের আরশকে তাদের ঊর্ধে ধারণ করবে।

وَالْمَلَكُ عَلَى أَرْجَائِهَا وَيَحْمِلُ عَرْشَ رَبِّكَ فَوْقَهُمْ يَوْمَئِذٍ ثَمَانِيَةٌ

এবং ফেরেশতাগণ আকাশের প্রান্তদেশে থাকবে ও আট জন ফেরেশতা আপনার পালনকর্তার আরশকে তাদের উর্ধ্বে বহন করবে। সুরা হাক্বকাহ আয়াত : ১৭

আর এরাই হল সে সমস্ত ফিরিশতাগণ যারা মুমিন মোক্তাকী বান্দাহদের জন্য আল্লাহর নিকট মাগফেরাত কামনা করে এবং দোয়া করে। যার বিবরণ কোরআনে এভাবে রয়েছে:

اَلَّذِیۡنَ یَحۡمِلُوۡنَ الۡعَرۡشَ وَ مَنۡ حَوۡلَہٗ یُسَبِّحُوۡنَ بِحَمۡدِ رَبِّہِمۡ وَ یُؤۡمِنُوۡنَ بِہٖ

وَ یَسۡتَغۡفِرُوۡنَ لِلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا ۚ رَبَّنَا وَسِعۡتَ کُلَّ شَیۡءٍ رَّحۡمَۃً وَّ عِلۡمًا

فَاغۡفِرۡ لِلَّذِیۡنَ تَابُوۡا وَ اتَّبَعُوۡا سَبِیۡلَکَ

وَ قِہِمۡ عَذَابَ الۡجَحِیۡمِ

যারা আরশকে ধারণ করে এবং যারা এর চারপাশে রয়েছে, তারা তাদের রবের প্রশংসাসহ তাসবীহ পাঠ করে এবং তাঁর প্রতি ঈমান রাখে।

আর মুমিনদের জন্য ক্ষমা চেয়ে বলে যে, ‘হে আমাদের রব, আপনি রহমত ও জ্ঞান দ্বারা সব কিছুকে পরিব্যপ্ত করে রয়েছেন।

অতএব যারা তাওবা করে এবং আপনার পথ অনুসরণ করে আপনি তাদেরকে ক্ষমা করে দিন।

আর জাহান্নামের আযাব থেকে আপনি তাদেরকে রক্ষা করুন। সূরা মুমিন : আয়াত : ৭

رَبَّنَا وَأَدْخِلْهُمْ جَنَّاتِ عَدْنٍ الَّتِي وَعَدتَّهُم

وَمَن صَلَحَ مِنْ آبَائِهِمْ وَأَزْوَاجِهِمْ وَذُرِّيَّاتِهِمْ

إِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ

আল্লাহ কাদেরকে চিরকাল বসবাসের জান্নাতে প্রবেশ করাবেন?

হে আমাদের পালনকর্তা, আর তাদেরকে দাখিল করুন চিরকাল বসবাসের জান্নাতে, যার ওয়াদা আপনি তাদেরকে দিয়েছেন

এবং তাদের বাপ-দাদা, পতি-পত্নী ও সন্তানদের মধ্যে যারা সৎকর্ম করে তাদেরকে।

নিশ্চয় আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। সুরা মু’মিন আয়াত : ৮

وَقِهِمُ السَّيِّئَاتِ وَمَن تَقِ السَّيِّئَاتِ يَوْمَئِذٍ فَقَدْ رَحِمْتَهُ وَذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ

এবং আপনি তাদেরকে অমঙ্গল থেকে রক্ষা করুন। আপনি যাকে সেদিন অমঙ্গল থেকে রক্ষা করবেন, তার প্রতি অনুগ্রহই করবেন। এটাই মহাসাফল্য।

সুরা মু’মিন আয়াত : ৯

অনুরুপ ভাবে আরশ সম্পর্কে অনেক হাদিস রয়েছে। তার মধ্যে একটি হল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, তুমি খরচ কর। আমি তোমাকে দান করব।

حَدَّثَنَا أَبُو الْيَمَانِ…عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ

‏ قَالَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ أَنْفِقْ أُنْفِقْ عَلَيْكَ

وَقَالَ ـ يَدُ اللَّهِ مَلأَى لاَ تَغِيضُهَا نَفَقَةٌ، سَحَّاءُ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ ـ

وَقَالَ ـ أَرَأَيْتُمْ مَا أَنْفَقَ مُنْذُ خَلَقَ السَّمَاءَ وَالأَرْضَ

فَإِنَّهُ لَمْ يَغِضْ مَا فِي يَدِهِ، وَكَانَ عَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ،

وَبِيَدِهِ الْمِيزَانُ يَخْفِضُ وَيَرْفَعُ

আবূল ইয়ামান (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

আল্লাহ তা‘আলা বলেন, তুমি খরচ কর। আমি তোমাকে দান করব এবং [রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] বললেন, আল্লাহ তা‘আলার হাত পরিপূর্ণ।

(তোমার) রাতদিন অবিরাম খরচেও তা কমবে না।

তিনি বলেন, তোমরা দেখ না, যখন থেকে (আল্লাহ) আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন, তখন থেকে কি পরিমাণ খরচ করেছেন?

কিন্তু এত খরচ করার পরও তাঁর হতে সম্পদের কোন কমতি হয়নি। আর আল্লাহ তা‘আলার ‘আরশ পানির উপর ছিল।

তাঁর হাতেই রয়েছে পাল্লা। তিনি ঝুকান, তিনি উপরে উঠান।

এ দুনিয়া সৃষ্টির আগে কি ছিল?

হাদিসের মাঝে এসেছে সাহাবায়ে কেরাম রসুলকে জিঙ্গাস করে ছিল এ দুনিয়া সৃষ্টির আগে কি ছিল?

حَدَّثَنَا عَبْدَانُ، عَنْ أَبِي حَمْزَةَ… عَنْ عِمْرَانَ بْنِ حُصَيْنٍ، قَالَ إِنِّي عِنْدَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم

إِذْ جَاءَهُ قَوْمٌ مِنْ بَنِي تَمِيمٍ فَقَالَ ‏”‏ اقْبَلُوا الْبُشْرَى يَا بَنِي تَمِيمٍ

قَالُوا بَشَّرْتَنَا فَأَعْطِنَا‏

فَدَخَلَ نَاسٌ مِنْ أَهْلِ الْيَمَنِ فَقَالَ ‏

اقْبَلُوا الْبُشْرَى يَا أَهْلَ الْيَمَنِ إِذْ لَمْ يَقْبَلْهَا بَنُو تَمِيمٍ ‏

قَالُوا قَبِلْنَا‏.‏ جِئْنَاكَ لِنَتَفَقَّهَ فِي الدِّينِ وَلِنَسْأَلَكَ

عَنْ أَوَّلِ هَذَا الأَمْرِ مَا كَانَ‏.‏ قَالَ ‏”‏ كَانَ اللَّهُ وَلَمْ يَكُنْ شَىْءٌ قَبْلَهُ

وَكَانَ عَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ، ثُمَّ خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضَ، وَكَتَبَ فِي الذِّكْرِ كُلَّ شَىْءٍ‏

আবদান (রহঃ) … ইমরান ইবনু হুসায়ন (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে ছিলাম।

এমন সময় তাঁর কাছে বনূ তামীম এর কাওমটি এল। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে লক্ষ্য করে বললেনঃ হে বনূ তামীম। তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর।

প্রতি উত্তরে তারা বলল, আপনি আমাদেরকে শুভ সংবাদ যখন প্রদান করেছেন, তাহলে কিছু দান করুন।

এ সময় ইয়ামানবাসী কতিপয় লোক নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সেখানে উপস্থিত হল। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের উদ্দেশ্যে বললেনঃ

হে ইয়ামানবাসী! তোমাদের জন্য সুসংবাদ। বনূ তামীম তা গ্রহন করল না।

তারা বলে উঠল, আমরা গ্রহণ করলাম শুভ সংবাদ। যেহেতু আমরা আপনার কাছে এসেছি দ্বীনী জ্ঞান হাসিল করার উদ্দেশ্যে এবং জিজ্ঞাসা করার জন্য এসেছি যে,

এ দুনিয়া সৃষ্টির আগে কি ছিল? নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আল্লাহ তখন ছিলেন, তাঁর আগে আর কিছু ছিল না।

তার আরশ তখন পানির ওপর ছিল। এরপর তিনি আসমান সমুহ ও যমীন সৃষ্টি করলেন। এবং লাওহে মাফফুযে সব বস্তু সম্পর্কে লিখে রাখলেন।

আমরা আল্লাহর আরশ কি এবং আল্লাহর আরশ বেষ্টনকারী কারা এ নিয়ে কোরআন হাদিস থেকে যে আলচনা করলাম তা থেকে যেন আমরা সকলে উপকৃত হতে পারি এ তাওফিক আল্লাহ আমাদের সকলকে দান করুক। আমিন।

Facebook Comments

1 Trackback / Pingback

  1. বোরাক শব্দের অর্থ কি | রফরফ ইসরা ও মেরাজ কি | Bangla Islam

Comments are closed.